যেখানে মারিগোল্ড ফুলের সুবাস আর মেক্সিকান পতাকায় সেজে উঠেছে পুরো শহর, যেখানে আকাশচুম্বী ভবনগুলো থেকে উঁকি দিচ্ছে ফুটবল তারকাদের বিশাল সব পোস্টার-ঠিক সেই উৎসবের গর্ভেই লুকিয়ে আছে এক বুকভাঙা হাহাকার। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী আমেজে ভাসছে মেক্সিকো সিটি। কিন্তু এই ফুটবল জোয়ারের সমান্তরালে শহরজুড়ে দানা বেঁধেছে এক বিশাল ক্ষোভ ও প্রতিবাদের দেয়াল।
ইতিহাসে প্রথম শহর হিসেবে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপকে বরণ করতে প্রস্তুত মেক্সিকো সিটি। তবে এই আলো ঝলমলে উৎসবের আড়ালে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছেন নিখোঁজ মানুষদের স্বজনেরা। শহরের অন্যতম প্রধান নিদর্শন ‘অ্যাঞ্জেল অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’-এর পাদদেশ এখন ঢাকা পড়েছে হাজারো নিখোঁজ মানুষের লেমিনেটিং করা ছবিতে। সেখানে স্প্যানিশ ও ইংরেজি দুই ভাষায় লিফলেট বিলি করছেন স্বেচ্ছাসেবকেরা, যাতে সরাসরি লেখা, ‘আমরা নিখোঁজ মানুষদের খুঁজছি।’
সেই লিফলেটের একটি লাইন স্তব্ধ করে দিয়েছে উৎসবের নগরীকে। লেখাটির বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘আমরা ১ লক্ষ ৩৩ হাজারেরও বেশি নিখোঁজ মানুষকে খুঁজছি, যাদের আমরা প্রতিটি দিন ভালোবাসায় আর অপেক্ষায় স্মরণ করি। এই সংখ্যাটি ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতার চেয়েও দেড় গুণ বেশি! এ দেশে প্রতিদিন গড়ে এক বাসভর্তি মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়। বিশ্বকাপ তো নিজের ঘরে ফিরলো, কিন্তু আমাদের প্রিয়জনেরা কবে ঘরে ফিরবে?’
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের এই বিপুল উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাসীর বিবেককে নাড়া দিতে চান এই আন্দোলনকারীরা। ইউনাইটেড ন্যাশনস (ইউএন) মেক্সিকোর এই নিখোঁজ পরিস্থিতিকে ‘এক বিশাল মানবীয় ট্র্যাজেডি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। সাবেক মেক্সিকান ফুটবলার জোয়াকিন বেলত্রান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারের কিছু সিদ্ধান্তে দেশের বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। তবে যারা দেশের চলমান পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট নন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের আওয়াজ পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশ্বকাপ তাদের সামনে একটা বড় সুযোগ।’
প্রতিবাদের এই আগুন শুধু নিখোঁজের স্বজনদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই। শহরের প্রাণকেন্দ্র ‘পাসিও দে লা রিফর্মা’য় জড়ো হয়েছেন শত শত আন্দোলনকারী শিক্ষক। বেতন, পেনশন আর কর্মপরিবেশের উন্নতির দাবিতে ধর্মঘট করছেন তারা। এমনকি মেক্সিকানদের একাংশের মতে, এই বিশ্বকাপ সাধারণ মানুষের জন্য নয়। ক্ষুব্ধ এক শিক্ষককে মাইক্রোফোনে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের বিশ্বকাপের কোনো প্রয়োজন নেই, আমরা শুধু বাঁচার মতো উন্নত বেতন চাই। এই বিশ্বকাপ স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি হয়নি, এটি তৈরি হয়েছে ধনী ব্যবসায়ীদের জন্য, যারা চড়া মূল্যের টিকিট কেনার সামর্থ্য রাখে।’
