মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র নিজেদের মতো করে বদলে ফেলা যাবে। সেই মানচিত্র আসলেই বদলাচ্ছে, তবে তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী নয়। ইরানকে পরাজিত করা যায়নি। বরং বর্তমান পরিস্থিতি এক দীর্ঘমেয়াদী ও ক্ষয়িষ্ণু সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে পুরোদস্তুর যুদ্ধের রূপ নিতে পারে।
তেহরানের শাসনব্যবস্থা যে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্তশালী তা এখন প্রমাণিত। তাদের হিসেব-নিকেশ ভুল ছিল এবং এর ফলাফলের ওপর থেকে তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। এর সর্বশেষ প্রমাণ হলো হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অ্যাপাচে হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। এটি ওয়াশিংটনের জন্য আরও একটি কড়া বার্তা যে, তেহরানের শাসকরা এখনো আমেরিকাকে আঘাত করার ক্ষমতা রাখেন।
একই সঙ্গে এই যুদ্ধে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে তারা যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত। ইরানের কাছে বিজয়ের অর্থ হলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং পারস্য উপসাগরের সবচেয়ে কৌশলগত নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে শত্রুকে চাপে রাখা। ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথের বাণিজ্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে আছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তার জেনারেলরা এখন যুদ্ধের সর্বশেষ সংযোজন হরমুজ প্রণালিতে এই হেলিকপ্টার হারানোর ধকল সামলে এমন একটি জবাব খোঁজার চেষ্টা করছেন, যা একই সাথে আমেরিকার শক্তিও প্রদর্শন করবে আবার ধীরগতির নিষ্ফলা কূটনৈতিক পথকেও বাঁচিয়ে রাখবে। এই ঘটনায় কপ্টারের ক্রু সদস্যরা কোনক্রমে বেঁচে গেছেন। তারা নিহত হলে মার্কিন প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি কঠোর হতো।
ট্রাম্প মূলত ইরানের সাথে একটি চুক্তি করার জন্য মুখিয়ে আছেন। যাতে হরমুজ প্রণালী আবার খুলে দেয়া যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী আলোচনার পথ তৈরি হয়। এই যুদ্ধ খোদ আমেরিকার মাটিতেই জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। এখন ট্রাম্প এমন একটি উপায় খুঁজছেন যা তিনি নিজ দেশে ‘বিজয়’ হিসেবে প্রদর্শন করতে পারেন। তবে কাজটি মোটেও সহজ হচ্ছে না। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু এখন যুদ্ধের সেই পুরানো ঐতিহাসিক সত্যেরই মুখোমুখি হয়েছেন, যেকোনো যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, একটি সুনির্দিষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ঠিক ততটাই কঠিন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তখন উভয়ের ভিডিও বার্তাতেই এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছিলো। ১৯৭৯ সাল থেকে চলে আসা ইরানের শাসনব্যবস্থা এবার ক্ষমতাচ্যুত হতে যাচ্ছে এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন তারা। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে বসে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন, তাদের মুক্তির সময় সমাগত।
পরদিন সকালে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদ থেকে নেতানিয়াহুও ঘোষণা করেন, যে স্বপ্ন তিনি ৪০ বছর ধরে দেখছেন, এবার তা পূরণ হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই নেতানিয়াহু যুক্তি দিয়ে এসেছেন যে, ইসরাইলের আসল শত্রু ফিলিস্তিন বা আরবরা নয়, বরং ইরান। তিনি পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের রাজি করাতে না পারলেও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সফল হন। ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে নেতানিয়াহু ইসরাইলিদের বলেন যে, আমেরিকার সমর্থনে তাদের সামরিক শক্তি শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করবে এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ এনে দেবে। কূটনীতি নয়, সামরিক শক্তিই ছিল তার একমাত্র সমাধান। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন। গত সোমবার ট্রাম্প যখন তাকে বৈরুতে আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিলের নির্দেশ দেন, তখন ইসরাইলি কলামিস্ট বেন কাস্পিতের ভাষায়, নেতানিয়াহুকে দেখতে একটি ‘হাওয়া বের হওয়া ফুসকো বেলুনের’ মতো লাগছিল। সামরিক শক্তি দিয়ে পুরো অঞ্চলকে নিজের ইচ্ছাধীন করার যে কৌশল নেতানিয়াহু নিয়েছিলেন, তা স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্প একটি দ্রুত বিজয় আশা করেছিলেন। ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যেভাবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বন্দি করে নিউ ইয়র্কের জেলে ভরেছে এবং কারাকাসে নিজেদের পছন্দের উত্তরসূরি বসিয়েছে, ট্রাম্প ভেবেছিলেন ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই ফর্মুলা খাটবে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও আমেরিকা ও ইসরাইল আজ ভাবছে কোথায় ভুল হলো? তারা ভেবেছিলেন নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত ইরান হয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। বিশেষ করে যখন তাদের মিত্র হামাস, হিজবুল্লাহ এবং সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে, তখন ইরানকে একা ভেবেছিলেন তারা। কিন্তু তারা এই ইসলামিক শাসনের সহনশীলতা ও নিষ্ঠুরতাকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন।
তারা ভেবেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা ও তার শীর্ষ সহযোগীদের হত্যা করলেই হয়তো এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে ক্রমাগত হুমকির মুখে টিকে থাকার জন্য ইরান নিজেকে যেভাবে প্রস্তুত করেছে এবং তাদের ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নিরাপত্তার যে দেয়াল তৈরি করেছে, তার গভীরতা বুঝতে ভুল করেছিলেন ট্রাম্প-নেতানিয়াহু। এই যুদ্ধের ধাক্কা লেগেছে আমেরিকার মিত্র পারস্য উপসাগরীয় তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর গায়েও। এটি কেবল তাদের অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং স্থায়িত্ব ও বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্যিক স্বর্গ তারা গড়ে তুলতে চেয়েছিল, বর্তমান যুদ্ধ তাকে একটি মরীচিকায় পরিণত করেছে। তেহরান বিশ্বাস করে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করার এই সক্ষমতাই তাদের দীর্ঘমেয়াদে আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেবে। ইসরাইল ও আমেরিকার হামলায় নিহত পুরানো নেতাদের জায়গায় ইরানের যে নতুন নেতৃত্ব এসেছে, তারা আগের চেয়েও বেশি আদর্শিক এবং যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। ইরানের বর্তমান কৌশল হলো লেবাননের যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরের সংকটের সাথে জুড়ে দেয়া। ট্রাম্পের প্রতি তেহরানের স্পষ্ট বার্তা ইসরাইল যদি লেবাননে বোমা বর্ষণ বন্ধ না করে এবং হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যায়, তবে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়। ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহুকে বৈরুতে হামলা থামাতে বললেন, তখন তিনি পরোক্ষভাবে লেবানন ও উপসাগরীয় অঞ্চলের এই পারস্পরিক সংযোগকে মেনে নিয়েছেন। যদিও নেতানিয়াহু এই সংযোগকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ ও যুদ্ধ শেষের আকাক্সক্ষাকেই নেতানিয়াহুর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার জেদের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেবেন। গত মার্চ মাসে যখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়, তখন সতর্কবার্তা দেয়া হয় যে জুন মাসের মধ্যে এটি না খুললে বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়বে। জুনের এই সময়ে এসেও সেই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধই রয়েছে। কোনো বড় ধরনের কূটনৈতিক অলৌকিক ঘটনা ছাড়া এই সংকট অদূর ভবিষ্যতে কাটার কোনো সহজ লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

সৈয়দ নজরুল হুদা
৪৮ মিনিট আগেইরানের দৃঢ়তা আমেরিকার আধিপত্য ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছে।স্বৈরাচারী আধিপত্যবাদীদের পতন এ রকমই মর্মান্তিক হয়।