মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেই ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মুখে। দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অনীহা দেখালেও এখন তাদের মধ্যে অনেকেই প্রকাশ্যে তার নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন। শুধু গত এক সপ্তাহেই সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন রিপাবলিকান গোষ্ঠী ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের সমালোচনা করেছে। হোয়াইট হাউসের বলরুম নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ প্রত্যাখ্যান করেছে। তার ১.৮ বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে এবং অভ্যন্তরীণ নজরদারি সংক্রান্ত একটি আইনও আটকে দিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পকে অমান্য করে একটি বিল পাস করেছে। তাতে ইউক্রেনকে সহায়তা দেয়া এবং রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট এই বিলে ভেটো দেবেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই মনে করে না যে, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রকৃত অর্থে কোনো বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। তবে রিপাবলিকানদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ তার সঙ্গে মতবিরোধ প্রকাশে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এমনকি যেসব রাজনীতিককে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছেন, তারাও এখন ভিন্ন অবস্থান নিচ্ছেন। এর ফলে নির্বাচন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ট্রাম্পের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচিগুলো বাধার মুখে পড়তে পারে। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, আপনি দেখতে পাবেন আইনপ্রণেতারা তাদের ভোটাররা যা চান বলে মনে করেন, সেভাবেই ভোট দেবেন। উল্লেখ্য, ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল’-এর বিরোধিতা করার পর গত বছর টিলিস সিনেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।
ডেমোক্রেটরা অবশ্য এ ধারণা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, রিপাবলিকান পার্টির বৃহত্তর অংশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করতে প্রস্তুত নয়। ডেমোক্রেট সিনেটর জন ফেটারম্যান মাঝে মাঝে ট্রাম্প সমর্থিত উদ্যোগে ভোট দেন। তিনি বলেন, যারা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, তারা মূলত ট্রাম্পের দ্বারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরাই। বরং এটি প্রমাণ করে যে দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, রিপাবলিকানদের এই ভিন্নমত মূলত নির্বাচনী বছরের রাজনীতি। তিনি বলেন, প্রত্যেক সদস্য প্রতিটি ইস্যুতে রাজনৈতিক মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকবেন না। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন বলেন, গণমাধ্যম ও ডেমোক্রেটরা অস্তিত্বহীন বিভাজন তৈরি করার চেষ্টা করলেও আমরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা করছি।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নতুন প্রবণতা
বছরের পর বছর ধরে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা বিতর্কিত মন্ত্রিসভা সদস্যদের অনুমোদন, নির্বাহী আদেশের প্রতি নীরব সমর্থন এবং বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি ও নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইড-এ কাটছাঁট নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্পের প্রধান আইনগুলোকে সমর্থন দিয়ে তার প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। তবে আইনপ্রণেতা ও তাদের সহকারীরা বলছেন, ট্রাম্প যখন রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি ও জন কর্নিনের পুনঃনির্বাচন প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন এবং ধারাবাহিকভাবে অস্বস্তিকর সময়ে বিভিন্ন ঘোষণা দেন, তখন দলের ভেতরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায় মেমোরিয়াল ডে ছুটির ঠিক আগে। তখন ট্রাম্প কর্নিনের পুনঃনির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং তার ‘এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড’ ঘোষণা করেন। এর ফলে সিনেট রিপাবলিকানরা ৭০ বিলিয়ন ডলারের অভিবাসন আইন প্রয়োগ তহবিল বিল থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং ক্ষুব্ধ মনোভাব নিয়ে ওয়াশিংটন ত্যাগ করে। এক রিপাবলিকান সিনেট সহকারী বলেন, এটা ছিল একেবারে নিখুঁত ঝড়ের মতো পরিস্থিতি।
পরবর্তীতে শুক্রবার সিনেট ওই অভিবাসন আইন প্রয়োগ তহবিল বিল পাস করে। একই সঙ্গে রিপাবলিকানরা একটি ডেমোক্রেট সংশোধনীর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড বন্ধ করা। যদিও দলের কিছু সদস্য উদ্বিগ্ন যে এই অর্থ ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলায় অংশগ্রহণকারী দাঙ্গাকারী এবং ট্রাম্পের রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। ট্রাম্প তুলসি গ্যাবার্ড-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে তার ঘনিষ্ঠ সমর্থক বিল পুলটে’কে অস্থায়ী ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ডিএনআই) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। তবে এ নিয়োগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিপাবলিকানদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। সিনেটর মিচ ম্যাককনেল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি স্থায়ী ডিএনআই হিসেবে পুলটে’কে সমর্থন করবেন না। ম্যাককনেল বলেন, আইন অনুযায়ী এই পদে ব্যাপক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির প্রয়োজন। যে কোনো মনোনীত ব্যক্তি যদি এই শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি আমার ভোট পাবেন না।
সামনে মনোনয়ন যুদ্ধ
এ পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের বিরোধিতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। বৃহস্পতিবার নির্বাচনী ঝুঁকিতে থাকা তিন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স, জন হাস্টেড এবং ড্যান সুলিভান ডেমোক্রেটদের সঙ্গে মিলে ট্রাম্পের এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড নিষিদ্ধ করার উদ্যোগকে সমর্থন করেন। যদিও সেই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত পাস হয়নি। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রিপাবলিকান সিনেটর জিম ব্যাংকস ভোটাভুটির সময় বলেন, এই পুরো প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। তার মধ্যে আছে সীমান্ত নিরাপদ করা এবং আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-কে অর্থায়ন করা।
তবে ট্রাম্পের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে তার সাবেক আইনজীবী টড ব্ল্যাঞ্চকে স্থায়ী মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে মনোনয়ন দেয়া। এই মনোনয়ন সিনেটে কঠিন বাধার মুখে পড়তে পারে। প্রথমে বিষয়টি যাবে সিনেট জুডিশিয়ারি কমিটিতে, যেখানে সদস্য হিসেবে রয়েছেন ট্রাম্পের সমালোচক হয়ে ওঠা জন কর্নিন। কর্নিন বলেছেন, তার সমর্থন নির্ভর করবে ব্ল্যাঞ্চ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কী জবাব দেন তার ওপর। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত আইনজীবী নন। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে তিনি এই পার্থক্য বোঝেন এবং আইন যথাযথভাবে প্রয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
