ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হচ্ছে রোববার। এটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন। যার আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার হতে পারে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে সরকার। জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং ক্রমাগত দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব চাপ কমানোর লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আসন্ন বাজেটে এ খাতের জন্য একগুচ্ছ প্রণোদনা দেয়ার কথা বিবেচনা করছে সরকার। একইসঙ্গে, দেশীয় শিল্পে-বিশেষ করে হোম অ্যাপ্লায়েন্স বা গৃহস্থালি সামগ্রী, কম্পিউটার, ল্যাপটপ এবং বৈদ্যুতিক যান (ইভি) উৎপাদনে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে নতুন প্রণোদনা ঘোষণা করা হতে পারে। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় আগামী অর্থবছরে সরকারের ভর্তুকির বোঝা আরও ভারী হতে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আসন্ন বাজেটে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি রাখা হবে। খাদ্যে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বিদ্যুতে ৩৭ হাজার কোটি এবং অন্যান্য খাতে ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দেয়া হবে। সরকার মনে করছে, উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করা সম্ভব হবে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং সংস্কার ও ব্যবসা সহজীকরণ ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ই জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন অর্থবছরের এই বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন।
চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেটের মোট আকার দাঁড়াতে যাচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। সরকার বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। পাশাপাশি থাকবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ঘাটতি; যা মেটাতে ব্যাংক ও বিদেশি ঋণের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা বাজেট বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
ভর্তুকির চাপ: বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল ও সারের দাম বাড়ায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার ৫৫ শতাংশই যাবে বিদ্যুৎ ও সার খাতে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এরও অর্ধেকের বেশি ব্যয় হয়েছে বিদ্যুৎ ও সারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিশ্ববাজারে এলএনজি, জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা এবং সার খাতে ২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও সার ভর্তুকির জন্য মোট ৬৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই থাকবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ আরও বেশি বরাদ্দ চাইছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত গ্যাস ও ফার্নেসের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিদ্যুৎ খাতের জন্য গ্যাসের দাম বেড়েছে ২০৮ শতাংশ। পাশাপাশি ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মতো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নও ব্যয় বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে নিম্নআয়ের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে খাদ্য ভর্তুকিও বাড়ানো হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে এ খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রণোদনার বরাদ্দ প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, ডলারের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় এখন এ ধরনের প্রণোদনার প্রয়োজন আগের তুলনায় কমে এসেছে। প্রণোদনা চালুর সময় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এখন তা প্রায় ১২২ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এ সময়ে টাকার মান কমেছে প্রায় ৩৭ টাকা।
সৌরবিদ্যুতে করছাড়: বর্তমানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) প্রকল্পের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর করের হার ৩৬ থেকে ৬৩ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হতে পারে। এর পাশাপাশি, বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর জন্য করছাড়ের সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করা হতে পারে।
এদিকে সরকার গত বছরই বেশ কয়েকটি দেশীয় শিল্পের জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাটের হার ঘোষণা করেছিল। তবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে, যা এখন আরও তিন বছরের জন্য বাড়ানো হতে পারে। একইভাবে, ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর হ্রাসকৃত শুল্ক সুবিধার মেয়াদ চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও- এটিও ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তায় ৮ কর্মসূচি: বাজেটে সমাজের অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নারীদের স্বাবলম্বী করতে নেয়া হচ্ছে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। এ খাতে যুক্ত হচ্ছে নতুন আট কর্মসূচি। এর মধ্যে অন্যতম ফ্যামিলি কার্ড, যা বাস্তবায়নে খরচ করা হবে মোট বরাদ্দের সিংহভাগ। এ ছাড়া কৃষক কার্ড, কর্মহীন শ্রমিক সুরক্ষা, জুলাই শহীদ পরিবার ও আহতদের ভাতা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সম্মানীর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।
সিপিডি’র ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শুধু বাজেটের আকার বাড়ালেই প্রবৃদ্ধি বাড়ে না। বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজস্ব আহরণের বাস্তবসম্মত কৌশলই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সারের ভর্তুকি কমাতে হলে কৃষকের জন্য সারের দাম বাড়াতে হবে, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন সিদ্ধান্ত। তার ওপর বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ভর্তুকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খরচ কমাতে হলে ক্যাপাসিটি চার্জসংক্রান্ত চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
সংসদ সচিবালয় জানায়, রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে অধিবেশনটি যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এই অধিবেশনেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট পেশ ও পাস করার কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর জুন মাসে জাতীয় বাজেটের ওপর আলোচনার জন্য সংসদ অধিবেশন বসে, যা বাজেট অধিবেশন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন অধিবেশনে বর্তমান সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রতিফলন হিসেবে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হবে এবং এর ওপর সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনায় অংশ নেবেন। এর আগে গত ১২ই মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে, যা শেষ হয় গত ৩০শে এপ্রিল।
