দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রথম কারাবাস করলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেত্রী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ৩৯১ দিন কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হয়েছেন তিনি। ফিরেছেন শহরের দেওভোগে চুনকা কুঠিরে। তার মুক্তিকে ঘিরে সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও কারামুক্তির পর আইভী পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠজন এবং সমর্থকদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। বাসভবনে আগত শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করলেও তিনি এখনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা দেননি। তবে কারামুক্তির পর দেয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তিনি বিচার বিভাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দেশে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইভীর মুক্তি স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম বর্তমানে সীমিত থাকলেও দলটির সমর্থকদের একটি অংশ এখনো আইভীকেই জেলার অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক মুখ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
মুক্তির পর আইভীর প্রথম বক্তব্য: বাড়ি ফেরার পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী দেশের বিচার বিভাগ ও বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন: ‘আমি বিচার বিভাগের প্রতি অসম্ভব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং সরকারের প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আমি চাই, সকলকে নিয়ে একটি মানবিক সরকার গঠিত হোক। জেলে আমার মতো অনেক মায়েরা আছেন, যারা নিরপরাধ। আশা করছি, সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে।’ বাসায় প্রবেশের আগে তিনি স্থানীয় মাসদাইর কবরস্থানে গিয়ে তার বাবা, মা ও ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন।
চুনকা কুঠির এখন সরগরম: মুক্তির পর থেকেই আইভীর বাসভবনে আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী, সাবেক কাউন্সিলর, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দেখা করতে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন পর তাকে সামনে পেয়ে সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও আবেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দীর্ঘ কারাজীবনের হাসি-আনন্দ-বেদনার নানা কথা শেয়ার করছেন অনুসারীদের সঙ্গে। খোঁজখবর নিচ্ছেন তার জেলে যাওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে। দিনরাত বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের পদচারণায় মুখরিত চুনকা কুঠির। ফলে কারাগারে থাকার সময়ও তার জনপ্রিয়তা কমেনি- এমন মন্তব্য করছেন তার অনুসারীরা।
কারাগার থেকে মুক্তির পর সাবেক মেয়র আইভী তার বাড়িতে পৌঁছালে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে তার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তার দেওভোগের বাসভবনের চারপাশ এবং সামনের সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নতুন করে বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) নজরদারির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তার গতিবিধি ও বাড়িতে কারা আসছেন, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কারণে স্থানীয় অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী বা সাধারণ মানুষ সরাসরি বাড়িতে প্রবেশ করতে কিছুটা দ্বিধাবোধ করছেন। তবে তার আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তিত্ব তার সঙ্গে দেখা করে খোঁজখবর নিয়েছেন।
বিএনপি’র অন্দরেও আইভীকে ঘিরে আলোচনা: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী বরাবরই ব্যতিক্রমী একটি চরিত্র। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজ দলের প্রভাবশালী অংশের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে ওসমান পরিবারের সঙ্গে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি’র বিভিন্ন পর্যায়েও আইভীকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়। কেউ কেউ মনে করছেন, নারায়ণগঞ্জে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে আইভী একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। আবার বিএনপি’র একটি অংশের মতে, জনপ্রিয়তা থাকলেও অতীত রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় বিএনপি ও অন্যান্য দলের একাংশের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা আইভীর মুক্তির খবরে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার জামিন পাওয়া এবং নিজ এলাকায় ফিরে আসার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও সমালোচনা ব্যক্ত করছেন।
৫ই আগস্টে আওয়ামী লীগের চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর গুঞ্জন ওঠে, সাবেক রাষ্ট্রপ্রতি আব্দুল হামিদকে আহ্বায়ক ও নাসিকের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সদস্য সচিব করে আওয়ামী লীগের অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠিত হবে। তাদের নেতৃত্বে রিফর্ম আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু হবে। এমন গুঞ্জনের মধ্যেই ২০২৫ সালের ৭ই মে দিবাগত রাতে দেশ ছাড়েন দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। সেই ক্ষেত্রে ডা. আইভীও গোপনে দেশ ছাড়তে পারেন। এমন আশঙ্কায় দু’দিন পর ৯ই মে রাতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ঘটনা যাই হোক, জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনায় আইভীর নাম উঠে এসেছে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের এমন বিপর্যয়ের সময়েও বাড়িতে অবস্থান, গ্রেপ্তার, জামিনমুক্ত সবমিলিয়ে স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে আইভী এখন জাতীয় নেত্রী। এমনটাই আলোচিত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
এদিকে রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আইভী সবসময়ই একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী নাম। পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে টানা তিনবার সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে এখনো নগর রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে ধরে রেখেছে। স্বৈরাচারী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অতীতে তার অনমনীয় অবস্থানের কারণে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে তার একটা গ্রহণযোগ্যতা ছিল। ফলে তার মুক্তিতে আগামীদিনের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ কেমন হবে, তা নিয়ে পর্দার আড়ালে বিশ্লেষণ চলছে।
সচেতন মহল বলছেন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে প্রায় দুই দশক নারায়ণগঞ্জের নগরপিতার দায়িত্বে থাকা ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মুক্ত জীবন শুরু হলেও, তিনি এখন প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে অবস্থার মতোই দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার এই ফেরা, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও প্রশাসনের সতর্ক অবস্থান- সবমিলিয়ে আইভীকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির জল কোন দিকে গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
