রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির দাবি উঠেছে। তবে হাসপাতাল যাতে অতীত সেবাদানের ধারা অব্যাহত রাখতে পারে- অর্থাৎ, হাসপাতাল যাতে সচল থাকে সেটিরও দাবি রাখা হয়েছে। শনিবার রাজধানীর হোটেল হলিডে ইন-এ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি উঠে আসে। ঘটনায় হাসপাতাল ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজন করেন আইনজীবী শিশির মনির। সংবাদ সম্মেলনে আদ্-দীন মেডিকেল কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আব্দুস সবুর, হাসপাতালের মহাপরিচালকসহ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিশির মনির জানান, আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব নেয়াসহ আজীবন চিকিৎসাসেবা দেয়া, মেডিকেল কলেজে পড়ার উপযুক্ত কেউ থাকলে বিশেষ ছাড়ে পড়ার সুযোগ দেয়াসহ চাকরির সুযোগ দেবে। শিশির মনির বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে এবং হাসপাতালকে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এটি মোকাবিলা করবে।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য জায়গার চেয়ে আনুপাতিক হারে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কম দামে চিকিৎসা দেয়া হয় আদ্-দ্বীনে। আজ পর্যন্ত আদ্-দ্বীনে ১০ লাখ মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা নিয়েছে, ৩ লাখের অধিক ডেলিভারি করেছে। কিন্তু যা হয়েছে তার জন্য ভুক্তভোগী ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মর্মাহত। আমরা মনে করি, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ভুক্তভোগীদের পাশে থাকবে। আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ ও ভুক্তভোগীদের পরিবার মনে করে হাসপাতালের সেবা চালু রাখা প্রয়োজন। কিন্তু ‘উপযুক্ত ব্যক্তির’ এবং উপযুক্ত কারণে সুনির্দিষ্ট কারণে শাস্তি হওয়া উচিত। এই বিষয়ে হাসপাতাল প্রাথমিক ব্যবস্থা নিয়েছে।
এ সময় সরকারের তদন্ত প্রতিবেদনের সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, আমরা মনে করি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লাইসেন্স বাতিলের জন্য যে নোটিশ পাঠিয়েছে, সেটি আইনবহির্ভূত। সরকার যে আইনের আলোকে লাইসেন্স বাতিল করছে, সেই আইনে যেসব কারণে একটি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা যায়, সেসব কারণে একটিও এখানে বিদ্যমান নেই। তাই আমরা মনে করি- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই নোটিশ আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
হাবিবুর রহমান নামের একজন ভুক্তভোগী বলেন, আমার আগের দুই সন্তান এখানে নরমাল ডেলিভারিতে হয়েছে। এখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিলাম। এখানে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এটার ক্ষতিপূরণ কেউ দিতে পারে না। শাস্তি অনেক রকম হয়। আমরা ইতিমধ্যে মামলা করেছি। আমরা চাই, আদ্-দ্বীনের সার্ভিস যাতে চালু থাকে। দেশের মানুষ যাতে বঞ্চিত না হয়। দেশের মানুষকে ক্ষতি করে তাদের সার্ভিস যাতে বন্ধ না করা হয়। তাদের সার্ভিসে ত্রুটি থাকলে সেটি সংশোধন করুক। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সকলেই মর্মাহত। তিনি বলেন, আমরা চাই যারা মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি দোষী সাভ্যস্ত হবে তাদের যাতে সর্বোচ্চ শাস্তি হয়।
এর আগে, গত ২৭শে মে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ৬ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ রুমে মোট ১১ জন মা ও ৬ শিশু ছিল। রাত ২টা থেকে ৩টার দিকে একজন মা বেশি ঠান্ডা লাগায় এসি বন্ধ করতে বলেন। পরবর্তীতে ১ ঘণ্টার জন্য এসি বন্ধ করা হয়। এ সময় অন্যান্য শিশুদের শ্বাসকষ্ট তৈরি হয়। পরে ভোর ৬টা থেকে শিশুদের অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে এবং একে একে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই রুমে কোনো ভেন্টিলেশন ছিল না, তাই হয় তো এসি বন্ধ রাখায় শ্বাসকষ্ট বা সাফোকেশনের কারণে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। পরে গত বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তদন্ত প্রতিবেদনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলার’ প্রমাণ পাওয়ার কথা জানায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি; দীর্ঘক্ষণ এসি বন্ধ থাকা এবং বিকল্প কোনো ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা না থাকা; বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়াই শিশুগুলোর মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ। একইদিন মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজের বিধান লঙ্ঘন করায় কেন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে এই নোটিশ দেয়া হয়।
