পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভোট পরবর্তী অশান্তি ও হিংসা নিয়ে যখন উত্তপ্ত রাজনীতি ঠিক তখনই ঘটেছে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রাঠের হত্যাকাণ্ড। ফলে রাজ্যের পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুধবার রাত সাড়ে দশটা নাগাদ কলকাতা সংলগ্ন মধ্যমগ্রামে যশোহর রোডের উপরে চন্দ্রনাথকে সামনে থেকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হয় তার গাড়ির চালকও। কলকাতা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ। তিনি যে আবাসনে থাকেন তার ঠিক দু’শ মিটারের মধ্যে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে। ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।
বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, পরিকল্পনামাফিক ঠাণ্ডা মাথায় এই খুন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সূত্র পেয়েছে পুলিশ। তবে সঠিক তদন্তের স্বার্থেই ফুটেজের বিষয়ে কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি পুলিশের কাছ থেকে। পরে শুভেন্দু বলেন, আমি ভবানীপুর না জিতলে হয়তো ওকে খুন হতে হতো না। বিরোধী দলনেতা ছিলাম বলেই আমার পিএ হিসেবে ওকেও টার্গেট করেছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ায় বাইকে করে এসে চন্দ্রনাথের গাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় দুষ্কৃতরা। গাড়িতে চন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিলেন তার চালক। তাদের দু’জনকেই উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে, চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন। বুদ্ধদেবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বৃহস্পতিবার অপারেশন করে তার দেহ থেকে গুলি বের করা হয়েছে।
আরও জানা গেছে, একটি চার চাকার যান চন্দ্রনাথের গাড়ি অনুসরণ করছিল। সঙ্গে ছিল দু’টি মোটরবাইক। দোহাড়িকার মোড়ে গাড়িটির পথ রোধ করে চার চাকার গাড়িটি। এর পরেই বাইক থেকে নেমে এক দুষ্কৃতিকারী মুর্হুমুর্হু গুলি চালায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চন্দ্রনাথের বুকে- পেটে চারটি গুলি লেগেছে। গুলিতে হার্ট ফুটো হয়ে গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার তার মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে তার বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
চন্দ্রনাথ রাঠের হত্যার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়েছে। এই তদন্তকারী দলে রাজ্য পুলিশের অফিসারদের পাশাপাশি সিআইডি’র অফিসাররাও রয়েছেন। তবে কতোজন সদস্যকে নিয়ে এই সিট গঠিত হয়েছে তা প্রাথমিক ভাবে স্পষ্ট নয়। চন্দ্রনাথ হত্যার তদন্তে সিআইডি কাজ শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার সকালেই রাজ্যের তদন্তকারী সংস্থার অফিসাররা গিয়েছিলেন মধ্যমগ্রামের অকুস্থলে। রাজ্য পুলিশের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধিদল বুধবার রাতেই পৌঁছে যায় সেখানে। যে গাড়িটিতে চন্দ্রনাথ ছিলেন, সেই গাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। গাড়ির সামনের দিকে দু’টি আসনেই রক্তের ছোপ রয়েছে। সেই দু’টি আসনসহ গাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন তারা।
এই খুনের ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত বলেছেন, আমরা তদন্ত শুরু করেছি। আমরা একটি গাড়ি বাজেয়াপ্ত করেছি, যেটিকে অপরাধের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে নম্বর প্লেট বিকৃত করা হয়েছে। যে গাড়ির নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা আসলে শিলিগুড়ির একটি গাড়ির। কিন্তু আসলে এটা বিকৃত করা হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি কার্তুজ ও লাইভ রাউন্ড বাজেয়াপ্ত করেছি। আমরা যে তথ্য পেয়েছি, সেটা ধরে এগিয়ে চলেছি। পরে জানা গেছে, বিমানবন্দরের কাছ থেকে খুনে ব্যবহৃত একটি মোটরবাইক উদ্ধার করা হয়েছে।
শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রাঠের খুনকে একটি পরিকল্পিত, প্রতিহিংসাজনিত, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলেই মনে করছেন বিজেপি’র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শমীকের কথায়, সিংহ স্থবির বলে যদি কেউ মনে করে তাকে পদাঘাত করবে, সে ভুল করছে। সভাপতির বক্তব্য, চন্দ্রনাথ একজন অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজনীতির সঙ্গে তার দূরদূরান্তেও কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি শুধু একজনের আপ্তসহায়ক। এ হেন চন্দ্রনাথকে হত্যার উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শমীক।
ছেলের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন চন্দ্রনাথ রাঠের মা হাসি রানী রাঠ। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, দোষীরা শাস্তি পাক। আমি মা, তাই চাইবো না ফাঁসি হোক। আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাইছি। চন্দ্রনাথের মৃত্যুর জন্য রাজ্যের বিদায়ী শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের ‘গরম গরম বক্তব্য’কে দায়ী করেছেন তিনি।
অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এক্সে দেয়া পোস্টে হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে দাবি করেছে, আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত করা হোক। দলটি লিখেছে, বুধবার দিবাগত রাতে মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ রাঠের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
ভারতের বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মী চন্দ্রনাথ পূর্ব মেদিনীপুরের বাসিন্দা। জন্ম চণ্ডীপুরে। শুভেন্দুর সঙ্গে চন্দ্রনাথের পরিবারের যোগাযোগ নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্ব থেকে। শুভেন্দু তৃণমূলে যোগ দেয়ার পরে। ২০২০ সালে শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। চন্দ্রনাথের পরিবারও তার সঙ্গেই বিজেপিতে যান। ২০১৯ সালে শুভেন্দু রাজ্যের মন্ত্রী হলে জলসম্পদ দপ্তরের আপ্তসহায়ক করা হয়েছিল চন্দ্রনাথকে। তারপর শুভেন্দু বিজেপিতে গেলে তখন থেকেই তার আপ্তসহায়ক ছিলেন চন্দ্রনাথ। শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন তার দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। নির্বাচনেও শুভেন্দুর হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন চন্দ্রনাথ।
