ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাত ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। একদিকে সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটি ও আবাসিক এলাকায় হুতিদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, অন্যদিকে জবাবে সৌদি আরবের ৪৮ ঘণ্টায় ১২৯টি বিমান হামলা করেছে। লৌহিত সাগর উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি হুতিদের দখলে চলে যাওয়ায় এখন সৌদি আরবের জ্বালানি ও তেল রপ্তানি খাত চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। । এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে দাবি করেন, সৌদি আরবের নাজরান প্রদেশের শারুরায় অবস্থিত সামরিক ঘাঁটির অস্ত্রাগার এবং কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল রুম লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে। এ অভিযানে বিপুল সংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে নিখুঁত আঘাত হানা হয়। লড়াই চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সৌদি আরবের আরও গভীরে ‘অধিকতর কঠোর ও ব্যাপক’ হামলা চালানোর সরাসরি হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। একই সময়ে সৌদি আরবের জাজান অঞ্চলের আল-তুওয়াল গভর্নরেটে হুতিদের ছোড়া গোলায় দুইজন আহত হয়েছেন এবং একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সৌদি সিভিল ডিফেন্স বেসামরিক স্থাপনায় এই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ আখ্যা দিয়েছে।
৪৮ ঘণ্টায় সৌদির ১২৯ বিমান হামলা
শারুরা ও জাজানে হামলার পরপরই হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। হুতি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি অভিযোগ করেন, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি আরবের এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে অন্তত ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। খামিস মুশাইত ও তায়েফ বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমানগুলো তাইজ, মারিব, হোদাইদাহ, আল-জাওফ, সাদা, আমরাণ ও হাজ্জাহ প্রদেশে এই বোমাবর্ষণ চালায়। এই আগ্রাসনের জবাবে হুতিরা হুঁশিয়ারি জানিয়ে বলে, তাদের জনগণের ওপর চালানো এই হামলার কঠোর জবাব অবশ্যই দেয়া হবে।
সৌদি তেল শিল্পে নৌ-অবরোধের হুমকি
সম্প্রতি কৌশলগত মোখা বন্দরসহ ইয়েমেনের পুরো লৌহিত সাগর উপকূলরেখা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি দ্বীপ দখল করে নিয়েছে হুতিরা। এতে তারা এখন একেবারে কাছাকাছি দূরত্ব থেকে সৌদি জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গাজা যুদ্ধের সময় যেভাবে নৌ-অবরোধ সৃষ্টি করে ইসরাইলের হাইফা ও এইলাত বন্দরকে অচল করে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক একইভাবে সৌদি আরবের বিরুদ্ধেও কঠোর নৌ-অবরোধ চাপিয়ে দিতে যাচ্ছে হুতিরা।
হুতিদের রণকৌশল ও বিরোধীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় প্রায় চার বছরের আপেক্ষিক শান্তির পর গত জুলাই থেকে ইয়েমেন সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। যেখানে ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত ও লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ‘বাশা রিপোর্ট’-এর প্রধান বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা জানান, হুতি যোদ্ধারা পাহাড়ি পথ, চোরাগোপ্তা হামলা ও ড্রোন ব্যবহার করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা করেছে। তবে হুতিদের এই অভাবনীয় অগ্রগতির মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে দায়ী করেছেন তিনি। তার মতে, বিভক্ত কমান্ড ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত আটটি ভিন্ন বাহিনী নিয়ে হুতিদের মতো একটি সুসংহত শক্তিকে হারানো অসম্ভব। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ, এতে বিদেশি সহায়তা সীমিত প্রভাবই ফেলতে পারে। সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ সতর্ক করেন, ইয়েমেন এখন এক ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক’ যুদ্ধাবস্থার মুখোমুখি।
