ইঁদুরবাহিত প্রাণঘাতী হান্টাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এখন বিশ্ব জুড়ে জরুরি তৎপরতা শুরু হয়েছে। কারণ, আক্রান্ত একটি বিলাসবহুল ক্রুজ জাহাজ থেকে নেমে যাওয়া যাত্রীরা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভাইরাসটির সংস্পর্শে শত শত মানুষ এসে থাকতে পারেন বলে উদ্বেগ বাড়ছে। এমভি হন্ডিয়াস নামের ক্রুজ জাহাজটি শনিবার থেকে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য আতঙ্কের কেন্দ্রে রয়েছে। জাহাজটিতে বিরল হান্টাভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।
এতে বলা হয়, যদিও সাধারণত ইঁদুরের মূত্র, মল ও লালার মাধ্যমে এই রোগ ছড়ায়, তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নিশ্চিত করেছে যে, এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসটি হলো হান্টাভাইরাসের বিরল ‘অ্যান্ডিস’ ধরন। এটিই একমাত্র পরিচিত হান্টাভাইরাস, যা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এই প্রাদুর্ভাবে ইতিমধ্যে তিনজন মারা গেছেন। তারা হলেন এক ডাচ্ দম্পতি এবং এক জার্মান নাগরিক। জাহাজটিতে এ পর্যন্ত আটটি সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। জাহাজটি আর্জেন্টিনার উশুয়াইয়া থেকে আফ্রিকার কেপ ভার্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। পুরো ভ্রমণটি তিনটি আলাদা অংশে বিভক্ত ছিল। যাত্রীরা চাইলে পুরো সফর একসঙ্গে নিতে পারতেন অথবা আলাদা অংশে ভ্রমণ করতে পারতেন।
এখনো নিশ্চিত নয়, ২০শে মার্চ উশুয়াইয়া থেকে অ্যান্টার্কটিকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া প্রথম যাত্রাপথে আক্রান্ত ডাচ্ দম্পতি ছিলেন কিনা। থাকলে তাদের সংস্পর্শে কতোজন এসেছিলেন, তাও অজানা। তদন্তকারীরা বলছেন, উশুয়াইয়ায় পাখি দেখার সময় ওই দম্পতি একটি ময়লার ভাগাড়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই সম্ভবত রোগবাহী ইঁদুরের সংস্পর্শে আসেন। পরে তারা ১লা এপ্রিল উশুয়াইয়া থেকে যাত্রা করা ক্রুজটিতে ওঠেন। জাহাজটিতে তখন ৮৮ জন যাত্রী ও ৫৯ জন ক্রু ছিলেন। মোট ২৩টি দেশের নাগরিক ছিলেন সেখানে। এখনো পরিষ্কার নয়, কতোজন যাত্রী শুধু অ্যান্টার্কটিকা অংশের জন্য অর্থ পরিশোধ করেছিলেন এবং ৩০শে মার্চ জাহাজটি আর্জেন্টিনায় ফেরার পর নেমে গিয়েছিলেন।
ডব্লিউএইচও চেষ্টা করছে কীভাবে হান্টাভাইরাসটি জাহাজে এলো, তা নির্ধারণ করতে। প্রথম মৃত ব্যক্তি- ৭০ বছর বয়সী এক ডাচ্ নাগরিক ৬ই এপ্রিল অসুস্থ হন। তিনি ১১ই এপ্রিল মারা যান। এ সময় জাহাজটি ট্রিস্টান দা কুনহার দিকে যাচ্ছিল। ওশানওয়াইড এক্সপেডিশনস জানিয়েছে, তার মরদেহ ২৪শে এপ্রিল পর্যন্ত জাহাজেই রাখা হয়েছিল। পরে সেন্ট হেলেনায় নামানো হয় তা। ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় আরও ২৩ জন যাত্রী জাহাজ থেকে নেমেছিলেন এবং পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ভ্রমণ করেন। এতে সংক্রমণ আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মৃত ব্যক্তির ৬৯ বছর বয়সী স্ত্রী সেন্ট হেলেনা থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ফ্লাইটে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে পৌঁছানোর পর ২৬শে এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।
ডব্লিউএইচও নিশ্চিত করেছে, ওই নারী ২৫শে এপ্রিল এয়ারলিংক পরিচালিত একটি বিমানে জোহানেসবার্গে যান। ওই বিমানে ৮২ জন যাত্রী ও ৬ জন ক্রু ছিলেন। তিনি গুরুতর উপসর্গ থাকা অবস্থায় জোহানেসবার্গ থেকে নেদারল্যান্ডসগামী আরেকটি বিমানে ওঠেন। তবে তার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে কর্মীরা তাকে নামিয়ে দেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এখন অন্তত ৮০ জন যাত্রীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন, যারা ওই নারীর সঙ্গে একই ফ্লাইটে ছিলেন। ২৭শে এপ্রিল ক্রুজের এক বৃটিশ যাত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অ্যাসেনশন দ্বীপ থেকে তাকে চিকিৎসার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় নেয়া হয়। কয়েকদিন পর আরেক যাত্রী এক জার্মান নাগরিক মারা যান।
৩রা মে এমভি হন্ডিয়াস কেপ ভার্দেতে পৌঁছালেও জাহাজটিকে ভিড়তে দেয়া হয়নি। ফলে যাত্রীরা কার্যত সমুদ্রে আটকা পড়েন। এরপর তিনজন রোগীকে নেদারল্যান্ডসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। সুইজারল্যান্ডে এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া সেন্ট হেলেনা থেকে দেশে ফেরা দুই বৃটিশ যাত্রী বর্তমানে বৃটেনে স্বেচ্ছানির্বাসনে আছেন। বৃটিশ সরকারের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভাইরাসটির উপসর্গ সাধারণত সংস্পর্শে আসার দুই থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে দেখা দেয়। তবে দুই দিন থেকে আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে আগামী দিন বা সপ্তাহগুলোতে আরও যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।
সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের প্রায় ৪০ শতাংশের মৃত্যু হয়। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আর্জেন্টিনার চুবুত প্রদেশের এপুয়েন শহরে অ্যান্ডিস ভাইরাসের আরেকটি প্রাদুর্ভাবে সংক্রমণের হার ছিল ২ দশমিক ২। অর্থাৎ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে আরও দু’জনের বেশি মানুষকে সংক্রমিত করতেন। বৃহস্পতিবার সকালে নিশ্চিত করা হয়েছে, জাহাজে থাকা এক অস্ট্রেলীয় নাগরিকও ২১শে এপ্রিল সেন্ট হেলেনায় নেমে দেশে ফিরে গেছেন।
