কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড। হামের সঙ্গে লড়ছে শিশুরা। কারও চোখ আধখোলা, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট, কেউ ঘুমিয়ে আবার কেউ চেঁচিয়ে কাঁদছে- এই দৃশ্য রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালের ওয়ার্ড জুড়ে।
হাসপাতালের তথ্য মতে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ১২১ জন চিকিৎসা নিয়েছে। ছাড়পত্র পেয়েছে ১২৫ জন। বর্তমানে ৪৭১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। হাসপাতালটিতে মার্চের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত ২০ জন মারা গেছে। চিকিৎসা নিয়েছে ৩ হাজার ৪৩৭ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩ হাজার ২৬৬ জন।
গতকাল হাসপাতালের ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে। একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের দীর্ঘ সারি। শরীরে জ্বর, লাল গোটা-ফুসকুড়ি, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া- এসব নিয়েই তারা লড়ছে। হামে আক্রান্ত এসব শিশুদের পাশে বসে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসায় অনেককেই বাঁচানো যাচ্ছে না।
এসব রোগীদের কেউ কেউ সন্তানদের চিকিৎসার জন্য কয়েক হাসপাতালও ঘুরেছেন। হাসপাতালটির শিশু ওয়ার্ডের ২০ নম্বর বেডে তিনদিন ধরে ভর্তি রয়েছে ১৬ মাস বয়সী মরিয়ম। তার শরীরে হামের লাল ফুসকুড়ি রয়েছে। শিশু মরিয়মের বাবা মো. রবিন বলেন, প্রথমে ঠান্ডা-জ্বর। এ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে দুইদিন ভর্তি ছিলাম মেয়েকে নিয়ে। সেখান থেকে রাখার মতো জায়গা না থাকায় বাসায় চলে আসি। এর একদিন পর শরীরে লাল ফুসকুড়ি ওঠে।
এরপর আবার ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাই, সেখান থেকে আমাদের রেফার করে ডিএনসিসি হাসপাতালে আসার জন্য। তিনদিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। তিনি বলেন, আগের চেয়ে একটু ভালো মনে হচ্ছে। মেয়ের এই অবস্থা নিয়ে অনেক কষ্ট হচ্ছে আমাদের। সব কাজ ফেলে হাসপাতালে সবসময় থাকতে হচ্ছে। আমার বড় ছেলেরও জ্বর, তাকে নিয়েও প্রতিনিয়ত ভয়-আতঙ্কে আছি- তারও হাম না হয়। এর জ্বর আসার দুইদিন আগে টিকা দেয়া হয়েছে।
১১ মাস বয়সী শিশু তানহা ২১ নম্বর বেডে ভর্তি রয়েছে। তার মা নাজমা রহমান বলেন, প্রথমে দুইদিন জ্বর ছিল।
দুইদিনের মাথায় হাম বের হয়েছে। আজ আট দিন ধরে জ্বর। প্রথমে পিজি হাসপাতালে ভর্তির জন্য দুইদিন ঘুরেছি কিন্তু বেড না থাকায় সেখানে ভর্তি করতে পারিনি। এরপর আজ এখানে নিয়ে আসি।
পাশাপাশি দুই বেডে ভর্তি রয়েছে দুই বছর বয়সী যমজ দুই ভাই হাসান ও হোসেন। তাদের পাশে থাকতে হচ্ছে পরিবারের চার সদস্যকে। এই যমজ দুই শিশুর দাদি রোকেয়া বলেন, মঙ্গলবার মিরপুরের কালশী থেকে নাতিদের নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। অনেক কষ্ট হচ্ছে এই দুই জনকে একসঙ্গে সামলাতে। কবে এই রোগ থেকে মুক্তি পাবে। আমার একমাত্র ছেলের সন্তান এরা। ওর বাবা অনেক কষ্ট করে রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালায়। কাজ ফেলে সারাক্ষণ হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। সেলাইন ছাড়া সবকিছু আমাদের কিনতে হচ্ছে।
সোমা বেগম বলেন, ঘুম নেই, ঠিকমতো খাওয়া নেই- অনেক কষ্ট হচ্ছে ওদের সঙ্গে আমাদেরও। সারা রাত জেগে একটা রেখে আরেকটাকে সামলাতে হচ্ছে। তিন-চারজন লোকের এখানে সবসময় থাকতে হচ্ছে। ওদের বাবাও কাজ বন্ধ রেখেছে। শিশুদের বাবা হযরত আলী বলেন, কাজ বন্ধ রয়েছে। আমি রাজমিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাই। এদের নিয়ে আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। রাজমিস্ত্রির কাজ করে মাসে ১০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। পরিবারের দুই বাচ্চাসহ ৬ জনের খরচ চালাতে হয়। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। কয়েকটা পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল দেয়া হয়েছে এক সপ্তাহ পরে রিপোর্ট আসবে। এই দুইজনই আমার প্রথম সন্তান, এরা সুস্থ থাকলে আমি সুস্থ থাকি।
পাঁচদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ১ বছর বয়সী রাইমা। তার নানি সোনিয়া বলেন, প্রথমে জ্বর আসে এরপর হামে আক্রান্ত হয়। এখন মোটামুটি সুস্থ রয়েছে। এর বড় বোন রহিমা হামে আক্রান্ত হয়ে দশদিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তার সেরে যাওয়ার পর এই নাতনির শুরু হয়। আমরা সাভার থেকে এসেছি। কয়েকদিন ধরে এভাবে হাসপাতালে কেটে যাচ্ছে আমাদের। এই হাসপাতালেই ২ জনের চিকিৎসা হচ্ছে। সুস্থ করে তোলার জন্য আমরা যুদ্ধ করে যাচ্ছি।
১৪ মাস বয়সী শিশু আদিল হাসানের মা পপি আক্তার বলেন, নরসিংদী বাড়ি আমাদের। প্রথমে ছেলের জ্বর আসে- সেসময় স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে হাম হয়েছে বলে জানায়। পরপরই আমরা ঢাকাতে নিয়ে আসি। এখন হাম, কাশি, সর্দি রয়েছে।
কয়েকটি পরীক্ষা করতে দেয়া হয়েছে রিপোর্টের অপেক্ষায় আছি। একবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে আমার ছেলেটি। শিশু রাজীবের মা ইয়ানুর বলেন, ছেলের বয়স দুই বছর চলে। মঙ্গলবার এখানে ভর্তি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে জ্বর, কাশি। এরপর নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। এখন শরীরে লাল লাল দেখা যাচ্ছে। ছেলের এই অসুস্থতা দেখে আমরাও ভেঙে পড়েছি। ঠিকমতো খাওয়া নেই, ঘুম নেই। ছেলেটাও ঘুমাতে পারছে না।
