দেশে দিন দিন গ্যাসের সংকট বেড়েই চলছে। আর এই সমস্যা সমাধানে সরকার নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। গ্যাস সন্ধানে নতুন নতুন কূপ খনন করা হচ্ছে। মাটির গভীর থেকে আরও গভীরে যাচ্ছেন বিজ্ঞ ভূতত্ত্ববিদরা। মাটির আরও গভীরে সম্ভাবনার খোঁজে নেমেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)।
প্রতিষ্ঠানটি অতীতের রেকর্ড ভেঙে এবার ৫৬০০ মিটার নিচে গত ১৯শে এপ্রিল শুরু করেছে কূপ খননের কাজ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সাধারণত মাটির অতল গভীরে গ্যাসের বড় মজুতের সম্ভাবনা থাকে। সেই রুদ্ধ দুয়ার খুলতেই ৫.৬ কিলোমিটার বা ১৮ হাজার ৩৭২ ফুট নিচ পর্যন্ত ড্রিল করা হবে। এটিকে ডিপ ড্রিলিং বলা হয়। দেশের প্রথম এই ডিপ ড্রিলিং সরজমিন দেখতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুর সফর। বিজিএফসিএল-এর তিতাস-৩১ ফিল্ডে পৌঁছানোর পর চোখে পড়ে কর্মচঞ্চল এক প্রান্তর। চীনা কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশি কর্মীরা।
মাটির বুক চিরে নিরবচ্ছিন্ন শব্দে ঘুরছে ২৬৮২ হর্সপাওয়ার সম্পন্ন উচ্চ ক্ষমতার আধুনিক রিগ (খনন যন্ত্র)। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন লোহার এক বিশাল বৃক্ষ শিকড় নামাচ্ছে পৃথিবীর গভীরে, যেখানে লুকিয়ে থাকতে পারে নতুন গ্যাসভাণ্ডারের।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৯০০ মিটার পর্যন্ত কূপ খননের ইতিহাস রয়েছে। এবার সেই সীমা পেরোনোর চেষ্টা। নতুন কূপ খননের স্থানে দাঁড়িয়ে কথা হয় বিজিএফসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী আব্দুল জলিল প্রামাণিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, এই কূপ খনন শেষে একই রিগ ব্যবহার করে বাখরাবাদেও আরেকটি কূপ খনন করা হবে। যার গভীরতা ৪৩০০ মিটার। এতে মোট ব্যয় হবে ৫৯৪ কোটি টাকা।
‘সবকিছু ঠিক থাকলে কূপ দু’টিতে ২ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে খনন শেষে পরীক্ষা- নিরীক্ষার পরই জানা যাবে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতোটুকু গ্যাস পাওয়া যাবে আর কতোটুকুই বা উত্তোলন করা যাবে। বর্তমানে দেশে কাগজে কলমে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪০০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি। বাস্তবে অন্তত ৫০০ কোটি ঘনফুটের চাহিদা রয়েছে। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। যার মধ্যে গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট আসে উচ্চমূল্যের আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে। দেশীয় গ্যাসের মজুত ফুরিয়ে আসায় দিন দিন জ্বালানি সংকট বাড়ছে। চাপ বাড়ছে আমদানি ব্যয়ের। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে ২ টিসিএফ গ্যাস পাওয়া গেলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে সংশ্লিষ্টরা।
খননে সময় লাগবে কতোদিন: তিতাস কূপটি খনন করতে সময় লাগবে ২১০ দিন। গত ১৯শে এপ্রিল থেকে এর খনন কাজ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর বাখরাবাদ-২১ ফিল্ডের খননে সময় ধরা হয়েছে ১৮০ দিন। কূপ খনন শেষে আরও কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হলেই শুরু হবে গ্যাস উত্তোলন। এরপর সরবরাহ হবে জাতীয় গ্রিডে।
সম্ভাবনার চার স্তর: সাধারণত ৩৭০০ থেকে ৫৪০০ মিটারের মধ্যেই গ্যাসের অস্তিত্ব বেশি থাকে। তিতাসেও মাটির নিচে মোট চারটি স্তরে গ্যাসের হাতছানি দেখছেন কর্মকর্তারা। প্রথম স্তরটি ৩৭৩৬ থেকে ৩৭৬৫ মিটার গভীরে। শেষ স্তর ৫৩১৫ থেকে ৫৩৪৪ মিটার। মাঝখানে রয়েছে আরও দু’টি সম্ভাবনাময় স্তর।
ঝুঁকি: মাটির নিচে ৩৭৫০ মিটার পার হলেই শুরু হবে উচ্চ চাপের এলাকা। এই চাপ সামাল দিতে না পারলে পুরো ড্রিলিং প্রক্রিয়া ভণ্ডুল হয়ে যাবে। তাই বাড়তি সতর্কতা হিসেবে এবার ব্যবহার হচ্ছে ১৫ হাজার পিএসআই সক্ষমতার ব্লো-আউট প্রিভেন্টর। অতীতের ১০ হাজার পিএসআই-এর সীমাবদ্ধতা ভেঙে এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিসিডিসি কাজটি বাস্তবায়ন করছে।
বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, এমন উচ্চক্ষমতার রিগ আগে দেশে ছিল না। প্রযুক্তিও এত উন্নত ছিল না। এই প্রকল্পে শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, আছে বড় প্রত্যাশাও। চীনা প্রতিষ্ঠানটির তাদের দেশে ১০ হাজার মিটার গভীরে কূপ খননের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
