পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই শক্তিশালী হরমুজ

এনডিটিভির বিশ্লেষণ

পারমাণবিক অস্ত্রের মতোই শক্তিশালী হরমুজ

ফন্ট সাইজ:

পারমাণবিক অস্ত্র, বিশেষ করে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। যদিও এটি ৯০ শতাংশ অস্ত্রমানের সীমার নিচে, তবুও প্রয়োজনে ৮ থেকে ১২টি বোমা তৈরি করার জন্য তা যথেষ্ট। যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক এই লক্ষ্যকেই ইরানের মানচিত্রে চিহ্নিত করেছিল, যা হয়তো প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথের দপ্তরে কিংবা পেন্টাগনের যুদ্ধকক্ষে টাঙানো ছিল।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ইসরাইল আশঙ্কা করে এসেছে- ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র পায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে। সৌদি আরব, মিশর বা তুরস্কও তখন একই পথে হাঁটতে পারে। এই আশঙ্কার পেছনে আরেকটি বড় কারণ ছিল পশ্চিম এশিয়ায় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। একটি পারমাণবিক সক্ষম ইরান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক দুর্বল করে দিতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের হুমকির মধ্যে থাকা ইরানও মনে করত নিজেদের নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, ইরানের আসলে পারমাণবিক প্রতিরোধের প্রয়োজনই ছিল না। কারণ, তাদের হাতে আছে হরমুজ প্রণালি।

‘হরমুজ’-একটি ভৌগোলিক পারমাণবিক অস্ত্র
তেহরান যখন তেলবাহী জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন পরিষ্কার হয়ে যায়, এই জলপথই যেন এক ধরনের ‘ভৌগোলিক পারমাণবিক অস্ত্র’। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০-২৫ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এটি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত হলে বিশ্ব অর্থনীতি মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় ইরান যেন এই ‘অস্ত্র’ ব্যবহার করে বসে এবং বুঝে যায়, ভবিষ্যতের সামরিক কৌশলে এটি সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে পারে। এ কারণেই তারা চায়, এই জলপথে তাদের ‘কর্তৃত্ব’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হোক।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানির প্রধান পথ, যা এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ করে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ২.১ কোটি ব্যারেল তেল এই পথে পরিবাহিত হতো। ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান- এই চার দেশ ২০২৫ সালে মোট তেলের প্রায় ৭৬ শতাংশ কিনেছে। তারা মিলেই বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও লাওসের মতো দেশগুলোও এই পথের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল এবং এখন তারা জ্বালানি সংকটে পড়েছে।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ধাক্কা
ইরান যখন এই পথ সংকুচিত করে, তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টার জানিয়েছে, ক্ষতির পরিমাণ ৩৩০০০ কোটি ডলার থেকে ২২ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ফেডারেল রিজার্ভ বলেছে, মাত্র এক ত্রৈমাসিক বন্ধ থাকলেও বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বছরে ২.৯ শতাংশ কমে যেতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

কীভাবে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করা হলো
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ৩৩ কিলোমিটার। এই সংকীর্ণ পথ ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপগুলোর পাশ দিয়ে গেছে, যা তাদের কৌশলগত সুবিধা দেয়। যুদ্ধ শুরু হলে ইরান তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা দেয় এবং সতর্কবার্তা দেয়। কিছু জাহাজে হামলা চালানো হয়। এর ফলে বীমা খরচ বেড়ে যায়, জাহাজ মালিকরা ঝুঁকি নিতে চায় না, তেল পরিবহন কমে যায়, বন্দরে তেল জমে যায় ও উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয় দেশগুলো। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। শুধু তেল নয়, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ গ্যাস এবং ৩৩ শতাংশ সারও এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ

ইউরোপের মিত্র দেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কারণ যুদ্ধ শুরুর সময় তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। জ্বালানির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের অসন্তোষ বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রেও একই অবস্থা জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ে, যা প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে। ট্রাম্প বারবার ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে হরমুজ খুলে দিতে বলেন, না হলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’র হুমকি দেন। কিন্তু ইরান সেই হুমকি উপেক্ষা করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের করার মতো তেমন কিছু ছিল না।

শান্তির পর কী হবে?
এ সপ্তাহে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হওয়ার কথা। বিশ্ব চায়, এই আলোচনা সফল হোক বা অন্তত যুদ্ধবিরতি অব্যাহত থাকুক। কিন্তু যুদ্ধ আবার শুরু হোক বা না হোক- ইরান এখন জানে, হরমুজ প্রণালি তাদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি। ইরান এমনকি প্রতি জাহাজে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত টোল আরোপের কথাও ভাবছে, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোও উদ্বিগ্ন, কারণ তাদের রপ্তানির প্রধান পথ এটি। জাতিসংঘ বলেছে, এমন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ সব দেশের জন্য খোলা ও নিরাপদ থাকতে হবে। তবে ইরান বলেছে, তারা এই মতের সঙ্গে একমত নয়। তারা জাতিসংঘ সমুদ্র আইন সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ নয়। ইরানের দাবি তাদের উপকূল থেকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত (প্রায় ২২ কিমি) এলাকা তাদের সার্বভৌম অধিকারভুক্ত। হরমুজ প্রণালির একটি অংশ তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে মনে করে।

Md. Nizamuddin Bhuiyan

১ মাস আগে

Very critical situation made by USA. Finally all impact goes to the poor country like Bangladesh.

মন্তব্য করুন