হুমকির মধ্যে ইসলামাবাদ আলোচনা প্রত্যাখ্যান করবে ইরান

আল জাজিরা, ডনের রিপোর্ট

হুমকির মধ্যে ইসলামাবাদ আলোচনা প্রত্যাখ্যান করবে ইরান

ফন্ট সাইজ:

সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘হুমকি অব্যাহত থাকায়’ ইসলামাবাদ সংলাপ প্রত্যাখ্যান করবে ইরান। তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, কোনো হুমকির মধ্যে শান্তি সংলাপে যাবে না। পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এমন সতর্কতা দিয়ে বলেছেন, যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে নতুন করে সামরিক সক্ষমতার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে তার দেশ। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ‘ট্রাম্প অবরোধ আরোপ করে, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে নিজের কল্পনায় তার আলোচনার টেবিলে বসার কথা বলছেন। তিনি নিজের কল্পনায় এটাকে আত্মসমর্পণের টেবিলে পরিণত করতে অথবা নতুন করে যুদ্ধবাজিকে ন্যায্যতা দিতে চাইছেন।’ আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ অব্যাহত রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এমন অবস্থায় শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা চরম আকার ধারণ করেছে। ডনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বুধবার পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা, ডন সহ বেশির ভাগ মিডিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা মঙ্গলবার শেষ হওয়ার কথা। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তা একদিন বর্ধিত করেন। আলোচনার জন্য মঙ্গলবার একটি মার্কিন প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে পৌঁছার কথা।

সিএনএন জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা মঙ্গলবার ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। একই সময়ে রয়টার্সকে এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, ইসলামাবাদের উদ্যোগে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিথিলের সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে তেহরান আলোচনায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। শেষ পর্যন্ত আল জাজিরা জানিয়েছে, এই সংলাপ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।

আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতি বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হবে। তিনি ব্লুমবার্গকে বলেন, সময়সীমার আগে কোনো চুক্তি না হলে দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। আগে এটি মঙ্গলবার ২১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৮টা (ইস্টার্ন সময়) শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সময় অনুযায়ী বুধবার সন্ধ্যায় শেষ হবে। ট্রুথ সোশালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, ইসরাইলের প্ররোচনায় তিনি এ হামলা চালাননি। তিনি লিখেছেন, ইরানে ফলাফল হবে অসাধারণ। ইরানের নতুন নেতৃত্ব (শাসন পরিবর্তন!) যদি বুদ্ধিমান হয়, তবে দেশটির সামনে উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ রয়েছে। আরেক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে, তা ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক চুক্তির চেয়েও ভালো হবে।

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের ‘অগঠনমূলক ও পরস্পরবিরোধী’ বার্তার সমালোচনা করে বলেন, এগুলো একটি ‘তিক্ত বার্তা’ বহন করে। তিনি এক্সে লিখেছেন, অঙ্গীকার রক্ষা অর্থবহ সংলাপের ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আচরণ নিয়ে ইরানের গভীর ঐতিহাসিক অবিশ্বাস রয়েছে, আর মার্কিন কর্মকর্তাদের অগঠনমূলক ও পরস্পরবিরোধী বার্তা থেকে বোঝা যায় তারা ইরানের আত্মসমর্পণ চায়। ইরানিরা শক্তির কাছে নতি স্বীকার করে না। তিনি আরও বলেন, তার দেশ সততা, প্রজ্ঞা ও বাস্তববোধ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করবে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র কূটনীতিতে আন্তরিক নয় এবং দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন করেছে। মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ইরানি পণ্যবাহী জাহাজে মার্কিন হামলা, ইরানের বন্দর অবরোধ এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে বিলম্ব- এসবই স্পষ্ট লঙ্ঘন। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চললেও প্রয়োজন হলে তেহরান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তিনি সতর্ক করে বলেন, আমরা শত্রুর ওপর ভরসা করি না। যে কোনো মুহূর্তে যুদ্ধ বাড়তে পারে।

ওমান উপসাগরে রোববার মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ জব্দ করার পর উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ট্রাম্প একে ইরানের বন্দর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে উল্লেখ করলেও তেহরান এটিকে জলদস্যুতা বলেছে এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির কাছে ড্রোন তৎপরতা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইরানও হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব অবরোধ আরোপ করে পরে আবার তা পুনর্বহাল করেছে। রয়টার্স জানায়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির ট্রাম্পকে বলেছেন, ইরানের বন্দর অবরোধ আলোচনা বাধাগ্রস্ত করছে। ট্রাম্প নাকি বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানান। তবে পরে ট্রাম্প বলেন, মুনির তাকে কোনো সুপারিশ করেননি। তিনি বলেন, এই অবরোধ খুব শক্তিশালী। এতে ইরানের প্রতিদিন ৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে। আমরা নিয়ন্ত্রণ করি, তারা নয়।

অবিশ্বাসের এই পরিবেশেও পাকিস্তান শান্তির পথ খুঁজতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন এবং উভয়েই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলে আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি দ্রুত সংলাপ চালুর গুরুত্ব তুলে ধরেন।

হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি ঘিরে বিশ্বশক্তিগুলোও সক্রিয় হয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং তা সবার স্বার্থে বলে উল্লেখ করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানান এবং হরমুজ প্রণালির অবরোধকে উভয় পক্ষের ভুল বলে অভিহিত করেন।

সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে ইসলামাবাদে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আশ্বাস দিয়েছেন। এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, প্রায় ২০ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মারগাল্লা পাহাড়, নূর খান বিমানঘাঁটি, ভিভিআইপি রুট, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন এলাকায় সেনা ও রেঞ্জার্স মোতায়েন করা হয়েছে।


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন