যুক্তরাষ্ট্রের আইসিই’র (আইস) বন্দি শিবিরে অমানবিক পরিস্থিতির অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জয়তু চৌধুরী (২৪)। এর আগে তার ভিসা বাতিল হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ আইস তাকে গ্রেপ্তার করেছ। রাখা হয় ডিটেনশন সেন্টারে। সেখানে অমানবিক পরিস্থিতির কারণে তিনি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তিনি দেশেই আছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।
জয়তু চৌধুরী বলেন, শুরুতে তিনি মামলার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং তার স্ত্রী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, তার সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় পৌঁছান, যেখানে নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া ও অসহায় মনে হয়। তিনি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন, যদিও তাকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য একটি তহবিল সংগ্রহ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
নিউজউইককে দেয়া সাক্ষাৎকারে জয়তু বলেন, শুরুর দিকে আমি আমার মামলাটির বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং গড়ে তোলা জীবন ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম। আমি হাল ছাড়তে চাইনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবেশ আমার মানসিক ও আবেগিক অবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এক পর্যায়ে আমি নিজেকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া অনুভব করি। ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। সবকিছু নিয়ে অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ি। শেষ পর্যন্ত আমি স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিই। আমি চাইতাম না দেশে ফিরতে। তবে মনে হয়েছিল আমার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। অনেক দিক থেকেই মনে হয়েছে, এই ব্যবস্থাই মানুষকে এমন অবস্থায় ঠেলে দেয়, যাতে তারা লড়াই চালিয়ে যেতে না পারে।
জয়তু চৌধুরী কে? কেন তিনি ফিরে এলেন?
স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন বলতে বোঝায়, আদালতের কোনো বহিষ্কার আদেশ ছাড়াই নিজ সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করা। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই পদ্ধতিকে উৎসাহিত করছে এবং এ পথে যাওয়া ব্যক্তিদের অর্থ সহায়তাও দিচ্ছে। জয়তু ২০২১ সালে এফ-১ স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ইলিনয় ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটিতে ফাইন্যান্সে মেজর ও কম্পিউটার সায়েন্সে মাইনর নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০২৫ সালের আগস্টে তার ভিসার স্ট্যাটাস বাতিল হয়। তার বিরুদ্ধে ডিইউআই (মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো) এবং খুচরা চুরির অভিযোগও ছিল। তিনি এসব ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের কারণে তার ভিসা বাতিল হয়। ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর আইস এজেন্টরা তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর শুরু হয় তার দুঃসহ অভিজ্ঞতা।
তাকে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের একাধিক ডিটেনশন সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, এসব কেন্দ্রের পরিবেশ অত্যন্ত অমানবিক এবং সেখানে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নেই। তিনি আরও জানান, দেশে ফেরার জন্য নিজে যে টিকিট কিনেছিলেন, তার কোনো অর্থ ফেরত পাননি। যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা নিউজউইককে জানিয়েছে, তাদের ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সুবিধা ও ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখা হয়।
টিকিট সংক্রান্ত বিষয়ে ডিএইচএস জানায়, জয়তু নিজে যে টিকিট কিনেছিলেন, তাতে দুবাই হয়ে যাত্রার জন্য পাসপোর্ট প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা তার কাছে ছিল না। পরবর্তীতে আইস ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তার জন্য একটি টিকিটের ব্যবস্থা করে, যাতে কোনো পাসপোর্টের প্রয়োজন হয়নি এবং এর জন্য তাকে কোনো অর্থ দিতে হয়নি।
বর্তমানে জয়তু বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। চলমান রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দৈনন্দিন জীবন অনিশ্চিত এবং কাজ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তার সহায়তায় গড়ে তোলা তহবিলের বিবরণে বলা হয়েছে, ‘এই অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি আশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, টিকে থাকার চেষ্টা করছেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।’ এই তহবিলটি চালু করেছেন মেরি এলেজ। তিনি জয়তু ও তার স্ত্রীকে পিকলবল কমিউনিটির মাধ্যমে চেনেন। জয়তুর স্ত্রী অ্যাশলি ইয়ামিলেট ২৪ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থী এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।
