ইরান যুদ্ধ: বহুল ব্যবহৃত ১০টি শব্দ ও তাদের অর্থ

আল জাজিরার রিপোর্ট

ইরান যুদ্ধ: বহুল ব্যবহৃত ১০টি শব্দ ও তাদের অর্থ

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে। এই সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এর মাধ্যমে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই বারবার এই পথে চলাচল সীমিত করেছে বা বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে। এই যুদ্ধে শিরোনামে থাকা অনেক শব্দ ও পরিভাষার পেছনে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক অর্থ। এখানে তার মধ্যে কয়েকটি তুলে ধরা হলো-

হরমুজ
হরমুজ প্রণালি হলো ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ জলপথ। এটি উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সামুদ্রিক রুট। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখানে চলাচল ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে, কখনো আংশিক, কখনো প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। ‘হরমুজ’ নামের সঠিক উৎস নিয়ে মতভেদ আছে। তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ধারণা অনুযায়ী এটি মধ্য পার্সিয়ান ভাষার ‘আহুরা মাজদা’ থেকে এসেছে। তিনি ‘জরোস্ট্রেইনিজম’ ধর্মের সর্বোচ্চ দেবতা। এর অর্থ ‘জ্ঞানী প্রভু’। এই সম্পর্ক সম্ভবত সাসানীয় যুগ বা তারও আগে থেকে এসেছে।
কম প্রচলিত কিছু মত অনুযায়ী, নামটি পার্সিয়ান ‘হুর’ (স্থির পানি বা জলাভূমি) এবং ‘মোগ’ (খেজুর গাছ) থেকে এসেছে, যার অর্থ হতে পারে ‘খেজুরের স্থান’। আবার কেউ কেউ গ্রিক শব্দ ‘হরমোস’ (উপসাগর বা খাঁড়ি) এর সঙ্গেও এর যোগসূত্র খুঁজে পান। ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যযুগে ‘হরমুজ রাজ্য’ নামে একটি ছোট কিন্তু ধনী সামুদ্রিক রাজ্য ছিল। এর কেন্দ্র ছিল বর্তমান হরমুজ প্রণালির আশপাশে। এর প্রভাব ছিল বাহরাইন পর্যন্ত।

শাহেদ
‘শাহেদ’ ড্রোন হলো ইরানের স্বল্পমূল্যের আত্মঘাতী ড্রোন। এটি বিস্ফোরক বহন করে এবং তুলনামূলকভাবে সহজ প্রযুক্তিতে তৈরি। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান এগুলো ব্যবহার করছে ইসরাইল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন ঘাঁটির বিরুদ্ধে। এই ড্রোনগুলো সাধারণত নিচু উচ্চতায় ওড়ে এবং অনেক সময় একসঙ্গে ঝাঁক আকারে ছোড়া হয়, যাতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা যায় এবং প্রতিরোধ ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ‘শাহেদ’ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে। এর অর্থ সাক্ষী। ফারসি ভাষাতেও শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।

টমাহক
‘টমাহক’ শব্দটি মূলত উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের ব্যবহৃত এক ধরনের কুঠার বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। যা শিকার, কাঠের কাজ ও যুদ্ধে ব্যবহৃত হতো। শব্দটি আলগনকুইন ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কাটার যন্ত্র’। আধুনিক সামরিক অভিযানে ব্যবহারে এটি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বোঝায়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দীর্ঘপাল্লার একটি অত্যন্ত নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র, যা হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধের শুরুতে ইরানের মিনাব শহরের একটি স্কুলে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রায় ১৭০টি শিশু নিহত হয়।

মিনাব
মিনাব শহরটি ‘শাজারে তয়্যেবেহ’ (অর্থ: ভালো গাছ) স্কুলের জন্য পরিচিত, যেখানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এটি সবুজ কৃষিভূমির জন্য পরিচিত এবং একে প্রায়ই ‘ওয়েসিস” বলা হয়। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত এই শহরটি বিশেষ করে সাইট্রাস ফল ও খেজুরের জন্য বিখ্যাত। ‘মিনাব’ নামের উৎস নিশ্চিত নয়। তবে ধারণা করা হয় এটি পার্সিয়ান শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ স্বচ্ছ পানি বা নীল পানি। আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, এটি ‘কালা-য়ে মিনা’ (মিনা দুর্গ) থেকে এসেছে, যেখানে মিনা শব্দের অর্থ নীল বা এনামেল। যদিও এই ব্যাখ্যা নিশ্চিত নয়।

বাব আল-মান্দেব
বাব আল-মান্দেব অর্থ ‘অশ্রুর দরজা’ বা ‘দুঃখের প্রবেশদ্বার’। এটি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি, যা ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যে অবস্থিত। এটি ভারত মহাসাগর থেকে লোহিত সাগরে প্রবেশের একমাত্র দক্ষিণ প্রবেশপথ এবং সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্য সংযোগ স্থাপন করে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী বারবার এই পথ বন্ধ করার হুমকি দিয়েছে।

এপিক (ফিউরি)
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ হলো ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের যৌথ সামরিক অভিযানের কোডনেম, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। ‘এপিক’ শব্দটি প্রাচীন গ্রিক ‘এপোস’ থেকে এসেছে। যার অর্থ কাহিনি বা গল্প। এর সঙ্গে ‘বীরত্বপূর্ণ’ বা ‘মহৎ’ অর্থও যুক্ত হয়েছে। ‘ফিউরি’ এসেছে ল্যাতিন ‘ফুরিয়া’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ক্রোধ বা উন্মাদনা। রোমান পুরাণে ‘ফিউরি’ ছিল প্রতিশোধ নেয়া দেবী। দুটি মিলিয়ে এপিক ফিউরি অর্থ দাঁড়ায় ‘মহাকাব্যিক ক্রোধ’ বা বিরাট রাগ।

আয়াতুল্লাহ
‘আয়াতুল্লাহ’ শিয়া মতাবলম্বীদের একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন উপাধি, যা ইসলামি আইন, ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় জ্ঞানে পারদর্শী আলেমদের দেয়া হয়। শব্দটি আরবি ‘আয়াহ’ (নিদর্শন) এবং ‘আল্লাহ’ (ঈশ্বর) থেকে এসেছে, যার অর্থ আল্লাহর নিদর্শন। ইরানে এই উপাধি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ধর্মীয় নেতারা রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, বিশেষ করে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত হন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন তার দ্বিতীয় ছেলে মুজতবা খামেনি।

খার্গ
খার্গ দ্বীপ ইরানের একটি ছোট দ্বীপ, যা দেশটির প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। এর কৌশলগত গুরুত্বের কারণে একে কখনো কখনো ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বলা হয়। খার্গ নামের উৎস স্পষ্ট নয়। তবে ধারণা করা হয় এটি প্রাচীন ইরানি ভাষা থেকে এসেছে এবং হয়তো ‘উষ্ণ স্থান’ বোঝায়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দ্বীপটি ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণের শিকার হয়। পরে তা পুনর্গঠন করা হয়। মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিমান হামলায় খার্গ দ্বীপের ৯০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়, যদিও জ্বালানি অবকাঠামো এড়িয়ে যাওয়া হয়।

কাফির
‘কাফির’ শব্দটি যুদ্ধের সময় আলোচনায় আসে, যখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের হাতে আরবি ট্যাটু দেখা যায়। এটি সাধারণত ‘অবিশ্বাসী’ হিসেবে অনুবাদ করা হয়, তবে এর আক্ষরিক অর্থ ‘যে সত্য গোপন করে’। শব্দটি আরবি ‘ক-ফ-র’ মূল থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘ঢেকে রাখা’ বা ‘লুকানো’।

খাতাম আল-আনবিয়া
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড করপস (আইআরজিসি)-এর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের নাম ‘খাতাম আল-আনবিয়া’। যার অর্থ ‘নবীদের সীলমোহর’। খাতাম অর্থ সীল এবং আল-আনবিয়া অর্থ নবীরা। এই শব্দটি পবিত্র কোরআনে ‘খাতাম আন-নাবিয়্যিন’ রূপে এসেছে। সেখানে হযরত মুহাম্মদকে (সা.) ‘নবীদের সীলমোহর’ বলা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন