গত সপ্তাহান্তে যখন হাজারো মানুষ বুদাপেস্টের রাস্তায় নেমে ভিক্টর অরবানের পরাজয় উদযাপন করছিল, তখন আর্থিক বিশ্লেষণকারী বালাস তার প্রপিতামহীর কথা ভাবছিলেন। তার প্রপিতামহী এখন আশির কোঠায়। তিনি হাঙ্গেরির পূর্বাঞ্চলের একটি দরিদ্র গ্রামীণ শহরে বসবাস করেন। হাঙ্গেরির নির্বাচনে জয় পেয়েছেন পিটার ম্যাজিয়ার। এক দশক ধরে মূলত রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর করায় পিটার মাজিয়ারের বিজয় তার কাছে আনন্দের নয়, বরং গভীর ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভিক্টর অরবানের পুনঃনির্বাচন প্রচারণার সময় তার শাসক দল ফিদেজ-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ম্যাজিয়ারকে শান্তির শত্রু হিসেবে তুলে ধরে। ৪২ বছর বয়সী আর্থিক বিশ্লেষক বালাস (যিনি শুধু তার প্রথম নাম ব্যবহার করেছেন) বলেন, তার প্রপিতামহী প্রতিদিন যে মিথ্যা শুনতেন, তা দেখে তিনি হতবাক। যেমন, ম্যাজিয়ার জিতলে হাঙ্গেরীয় পুরুষদের বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে নেয়া হবে, অর্থনীতি ধসে পড়বে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে।
তিনি সিএনএনকে বলেন, আপনি বয়স্ক, গ্রামে থাকেন, দরিদ্র। আপনার কাছে হয়তো দুইটা টিভি চ্যানেল আছে। রাষ্ট্রীয় রেডিও শুনছেন। ফলে আপনি এক ধরনের বিকল্প বাস্তবতায় বাস করছেন। বালাসের মতে, অরবানপন্থী এই প্রচারণা তাকে তার যৌবনের সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট প্রচারণার কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রধানমন্ত্রী-নির্বাচিত হিসেবে প্রথম কয়েকদিনেই ম্যাজিয়ার ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনামলে গড়ে তোলা প্রপাগান্ডা মেশিন ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই প্রপাগান্ডা মেশিন তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করতে এবং টানা চারটি নির্বাচন জিততে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থাই ১৮ মাস ধরে ম্যাজিয়ারকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে উপস্থিত হতে কার্যত বাধা দিয়েছিল, যদিও তার বিরোধী দল তিসজা পার্টি জনমত জরিপে এগিয়ে ছিল।
তিসজার বড় জয়ের পরেই কেবল তাকে সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়। বুধবার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত এম১ টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে ম্যাজিয়ার উপস্থাপকদের মিথ্যা ছড়ানোর জন্য তিরস্কার করেন। চ্যানেলটির প্রচারণাকে উত্তর কোরিয়া ও নাৎসি জার্মানির প্রচারের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, আমাদের ব্যক্তিগত কোনো বিদ্বেষ নেই। কিন্তু আমাদের কর্মসূচির একটি অংশ হলো তিসজা সরকার গঠনের পর এই মিথ্যার কারখানার অবসান ঘটানো। বিষয়টি আমার নয়, বরং সবাই এমন গণমাধ্যম পাওয়ার যোগ্য, যা সত্য তথ্য তুলে ধরে।
নির্বাচনের আগে ম্যাজিয়ার বলেন, তার বিজয় অনেক হাঙ্গেরীয়র কাছে ১৯৯৮ সালের দ্য ট্রুম্যান শো চলচ্চিত্রের মতো এক ধাক্কা লাগার অভিজ্ঞতা হবে, যেখানে একজন ব্যক্তি জানেন না যে তিনি একটি রিয়েলিটি শোর প্রধান চরিত্র। তিনি সতর্ক করেছিলেন, ভোটারদের মধ্যে মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে এবং অনেকেই এক রাতেই মত বদলাবে না।
বুদাপেস্টের ইওতভস লোরান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া আইন বিষয়ক অধ্যাপক গাবর পোলিয়াক বলেন, ছোট শহরের অনেক বয়স্ক মানুষ ম্যাজিয়ারের বিজয়ের পর ভয় নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি বলেন, আমি এমন মানুষের গল্প শুনেছি যারা হতাশায় ভুগছেন এবং বিছানার নিচ থেকে বের হতে পারছেন না। তবে পোলিয়াক আরও বলেন, এই বিজয় দেখিয়েছে যে অধিকাংশ হাঙ্গেরীয়, যারা স্থবির অর্থনীতি ও দুর্নীতিতে বিরক্ত, তারা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের কথা আর বিশ্বাস করে না। শেষ পর্যন্ত প্রচারকরা নিজেদের প্রচারণাতেই বেশি বিশ্বাস করেছে।
তবে সতর্ক করে তিনি বলেন, অরবানের তৈরি এই প্রচারব্যবস্থা ভাঙতে সময় লাগবে। এটি একটি বড় সুযোগ একটি স্বাভাবিক, কার্যকর ইউরোপীয় দেশ হওয়ার। যদি ম্যাজিয়ার এই সুযোগ কাজে না লাগান, আমরা আরেকটি সুযোগ পাব না।
অরবান ১৯৯৮ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। ন্যাটো সদস্যপদ নিশ্চিত করা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে দেশকে এগিয়ে নেয়ার পরও ২০০২ সালে ভোটাররা তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর তিনি বুঝতে পারেন, আবার বিরোধীদলে ফিরে যাওয়া ভালো ধারণা নয়। সিএনএনকে এমনটাই জানান তার ঘনিষ্ঠ একজন ব্যক্তি। ২০১০ সালে ক্ষমতায় ফিরে তিনি দ্রুত গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ায় ফিদেজ সরকার সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষমতা পায়। ২০১৩ সালে তারা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন সীমিত করার আইন পাস করে, যা মূলত তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সম্প্রচারমাধ্যমগুলোকে সুবিধা দেয়। একইসঙ্গে জাতীয় মিডিয়া কর্তৃপক্ষের প্রধান হিসেবে ফিদেজ-ঘনিষ্ঠ একজনকে নিয়োগ দেয়া হয়।
তদন্তমূলক সাংবাদিক সাবলচ পানিই বলেন, গণমাধ্যমে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ব্যবসায়িক দিক থেকে। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো ভিক্টর অরবানের মিত্রদের স্বল্প সুদে বা বিনামূল্যে ঋণ দেয়, যাতে তারা গণমাধ্যম কিনে নিয়ে বন্ধ করে দেয় বা ফিদেজের মুখপত্রে পরিণত করে।
রাষ্ট্র, যা হাঙ্গেরির সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনদাতা, দ্রুতই ফিদেজবিরোধী গণমাধ্যম থেকে বিজ্ঞাপন সরিয়ে নেয়। ক্লুবরেডিও ছিল প্রথম দিকের শিকারদের একটি। শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ওরিগো-তেও চাপ সৃষ্টি করা হয়। সাংবাদিক আন্দ্রাস পেথো জানান, ২০১৪ সালে অরবানের এক মন্ত্রীর বিলাসী ব্যয়ের খবর প্রকাশের পর সম্পাদককে তা বন্ধ করতে বলা হয়। কারণ এটি ভুল ছিল না, বরং সত্য ছিল। পরে সম্পাদক পদত্যাগ করেন এবং পেথো নিজেও চাকরি ছেড়ে ডিরেক্ট৩৬ প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনো সীমিত স্বাধীনতার মধ্যে কাজ করছে।
গত ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বিভিন্ন শত্রু তৈরি করেছে। যেমন দাতব্যকর্মী জর্জ সোরোস থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। পানিই বলেন, আপনি যখন শুধু এই খবরই দেখেন, তখন বাস্তবতা যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। এটাই আপনার বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড প্রেসম্যান বলেন, অরবান ভয়ভিত্তিক একটি করদাতাদের অর্থে পরিচালিত প্রচারণা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তবে ম্যাজিয়ার ভিন্ন কৌশল নেন। তিনি সরাসরি মানুষের কাছে যান। দুই বছরে ৭০০ শহর ও গ্রাম সফর করেন। এর ফলে ফিদেজের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। এখন অরবানের তৈরি এই ‘মিডিয়া মেশিন’ ভাঙতে সময় লাগবে। তবে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিসজা পার্টি সংবিধান পরিবর্তন করে নতুন মিডিয়া কাঠামো গড়তে পারবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসবে বেসরকারি খাত থেকে। কারণ অরবানের ঘনিষ্ঠরা এখনো বিপুল অর্থ দিয়ে ফিদেজপন্থী গণমাধ্যম চালিয়ে যেতে পারে। অনেক সাংবাদিকের কাছে এটি নতুন সূচনা মনে হলেও, সাংবাদিক পানিই মনে করেন এই মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে প্রথম অধ্যায় শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে।
