সারা দেশে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুরের দিকে ছয়টি জেলায় হঠাৎ বজ্রপাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জে পাঁচজন, ময়মনসিংহে দু’জন, রংপুরে দুই জেলে এবং নেত্রকোণা, হবিগঞ্জে ও কিশোরগঞ্জে একজন করে রয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪ জন। বিস্তারিত প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে-
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ধর্মপাশা উপজেলায় ২ জন, তাহিরপুর উপজেলায় ১ জন, জামালগঞ্জ উপজেলায় ১ জন এবং দিরাই উপজেলায় ১ জন রয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছেন অন্তত চারজন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ধর্মপাশায় বজ্রপাতে হবিবুর রহমান (২২) ও রহমত উল্লাহ (১৩) নামে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। হবিবুর উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের ফজলু রহমানের ছেলে এবং বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। রহমত জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের জয়নাল হকের ছেলে। হবিবুর চাচার সঙ্গে টগার হাওর সংলগ্ন চকিয়াচাপুর গ্রামে বোরো ধান কাটতে যান। দুপুরের দিকে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হলে বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
অন্যদিকে, জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর ইসলামপুর গ্রামে দুপুর ১টার দিকে বজ্রপাতের ঘটনায় জয়নাল হক (৩৫), তার ছেলে রহমত উল্লাহ এবং লাল সাধুর স্ত্রী শিখা মনি (২৫) গুরুতর আহত হন। পরে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রহমত উল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। অপর দু’জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এদিকে, জামালগঞ্জ উপজেলায় বজ্রপাতে নুর জামাল (২৬) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে এবং তোফাজ্জল হোসেন (২২) নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নুর জামালকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত তোফাজ্জল হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই দিনে উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের চান্দবাড়ি গ্রামের একটি স্কুল মাঠে বজ্রপাতে দু’টি গাভীরও মৃত্যু হয়েছে। দিরাই উপজেলায় বজ্রপাতে লিটন মিয়া (৩৮) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। কালিয়াগোটার হাওরে ধান কাটার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ছাড়াও, তাহিরপুর উপজেলায় বজ্রপাতে আবুল কালাম ওরফে কালা মিয়া (২৮) নামে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন এবং নূর মোহাম্মদ (২৪) নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। জামলাবাজ গ্রামের সামনে একটি হাঁসের খামারে কাজ করার সময় আকস্মিক বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই কালা মিয়ার মৃত্যু হয়। আহত নূর মোহাম্মদকে প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে দু’জন নিহত হয়েছেন। দুপুর ২টার দিকে গৌরীপুর ও গফরগাঁও উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন- গৌরীপুর উপজেলার কোনাপাড়া গ্রামের ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জ্বল (৩০) এবং গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের মৃত সেকান্দর আলী খানের ছেলে মমতাজ আলী খান (৫৮)। গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হযরত আলী বলেন, নিহত রহমত মুদি দোকানি। দুপুরে বজ্রপাতের সময় বোন জামাইয়ের ধানক্ষেত দেখতে পূর্বনামাপাড়া গ্রামে যান। সেখানে হঠাৎ বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় উজ্জ্বল। গৌরীপুর থানার ওসি কামরুল হাসান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। অপরদিকে, গফরগাঁও থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, নিহত মমতাজ ধাইরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি জোহরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথিমধ্যে হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
স্টাফ রিপোর্টার, কিশোরগঞ্জ থেকে জানান, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে দাওয়ালুদের সঙ্গে হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে হলুদ মিয়া (৩৫) নামে এক যুবক নিহত হন। দুপুরে উপজেলার গুনধর গ্রাম সংলগ্ন বড় হাওরে বজ্রপাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত হলুদ মিয়া উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের উত্তর কলাবাগ গ্রামের নূর ইসলামের ছেলে। জানা যায়, সকাল থেকে গুনধর গ্রামের সামনের বড় হাওরে দাওয়ালুদের সঙ্গে ধান কাটছিল হলুদ মিয়া। দুপুরে বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতের ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় হাওরে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন (৪০) নামে এক জেলের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে উপজেলার বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওরে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুনাম পূর্ব বড় ভাকৈর ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের সুন্দর আলী পীরের ছেলে। জানা যায়, দুপুরে বৃষ্টির মধ্যে মমিনা হাওরে মাছ ধরছিলেন সুনাম। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নেয়ার চেষ্টা করেন। তবে সেখানে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
রংপুরের মিঠাপুকুরে বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে দুই জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় অন্তত ১০ জন আহত হন। দুপুরে উপজেলার বড় হযরতপুর ইউনিয়নের সখীপুর ছোট শালমারা বিলে এ ঘটনা ঘটে। মিঠাপুকুর থানার ওসি মো. নুরুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নিহতরা হলেন- ছোট হযরতপুর মাঝিপাড়া গ্রামের অলিন রায়ের ছেলে মিলন রায় ও রামেশ্বরপাড়া গ্রামের আনছের আলীর ছেলে আবু তালেব। জানা যায়, সকালে অন্য জেলের সঙ্গে বিলে মাছ ধরতে যান তালেব ও মিলন। দুপুরের দিকে পরপর কয়েকটি বজ্রপাত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই একাধিক ব্যক্তি আহত হন। গুরুতর অবস্থায় তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে মিলন ও তালেবের মৃত্যু হয়। আহতদের মধ্যে গোল্ডেন মিয়া, তার স্ত্রী লিমা বেগম, মর্জিনা বেগম, জগদীশ রায়, সুবল, নিখিল রায়, শামছুলসহ ১০ জনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ শিকার দেখছিলেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়াও, নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলায় হাওরে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে আলতু মিয়া (৬৫) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। দুপুরে উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেষির হাওরে এ ঘটনা ঘটে। আলতু ওই গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে। জানা যায়, দুপুর ১টার দিকে গ্রামের সামনের মেষি হাওরে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান আলতু মিয়া। এর কিছুক্ষণ পর বৃষ্টিসহ বজ্রপাত শুরু হয়। বৃষ্টি শেষে স্থানীয় বাসিন্দারা হাওরে গিয়ে আলতু মিয়ার নিহর দেহ পরে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন। আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জুবায়দুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।
