চ্যাপায় ভাগ্য বদলালো যার

চ্যাপায় ভাগ্য বদলালো যার

ফন্ট সাইজ:

দেশের প্রান্তিক জনপদ ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা। এখানকার মানুষের জীবিকা নির্বাহ কিংবা পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস কৃষি। বাণিজ্যিকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ একেবারে নেই বললেই চলে। তবে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে বদলে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য। তাদেরই একজন জহুর আলী (৬০)। তিনি উপজেলা কাওয়ারকান্দা গ্রামের মৃত আব্দুল মোমিন এর ছেলে। পড়াশোনা না থাকলেও তিনি একজন সংগ্রামী এবং উদ্যমী মানুষ। তার বাবা ছিলেন চ্যাপা শুঁটকির খুচরা ব্যবসায়ী। অন্য জায়গা থেকে চ্যাপা কিনে এনে বাজারে বসে চ্যাপা শুঁটকি বিক্রি করতেন। বাল্যকাল থেকেই বাবার সঙ্গে চ্যাপা বিক্রি করতেন জহুর আলী। তিনি ছিলেন উদ্যমী মনোভাবের। বাবার ব্যবসার পাশাপাশি শুরু করেন চ্যাপা তৈরির কাজ। প্রথমে চ্যাপা তৈরি করে নিজেরাই বাজারে বিক্রি করতেন। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ২ লাখ টাকা মূলধন নিয়ে একশ’ মটকা দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চ্যাপা বা সিদল তৈরি শুরু করেন। একনিষ্ঠ পরিশ্রম ও উদ্যমী মনোভাব থাকায় আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ব্যবসার পরিধি। পরে স্থানীয় দুধনই বাজারের পাশে জায়গা কিনে স্থায়ীভাবে চ্যাপা তৈরি করে আসছেন। বর্তমানে তার ব্যবসায় এক হাজার পাঁচশ’ মটকায় চ্যাপা
তৈরি করেছেন। এ সব মটকায় অন্তত ২০ ধরনের চ্যাপা তৈরি করা হয়। যার বাজারদর প্রতি কেজি ২০০-৭০০ টাকা। গড়ে প্রতি মটকা বিক্রি করা হয় ৪০ হাজার টাকায়। প্রতি বছর অন্তত ৬ কোটি টাকার চ্যাপা বিক্রি করেন জহুর আলী। উপজেলার দুধনই বাজারে গিয়ে দেখা যায় একটি ঘরে ৩ নারী ও দুই পুরুষসহ পাঁচজন শ্রমিক চ্যাপা তৈরি করার জন্য শুঁটকি মাছ বাছাই করছেন। তাদের একজন ৬৫ বছরের বৃদ্ধা হালিমা খাতুন। স্বামী মারা গেছ বেশ কয়েক বছর আগে। পরিবারের অভাব-অনটন মেটাতে অন্তত ১৫ বছর ধরে জহুর আলীর এই চ্যাপা তৈরির কাজ করছেন। বৃদ্ধা হালিমার মতো এখানে চ্যাপা তৈরির কাজ করেন অন্তত ১২ জন শ্রমিক। যাদের সবাইকে দৈনিক ভিত্তিতে ৩০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি প্রদান করা হয়। কারিগররা জানান, আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করি। মালিক দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শুঁটকি মাছ কিনে আনেন। আমরা শ্রমিকরা এখানে বাছাই করে পানিতে ধুয়ে পরিষ্কার করে মটকায় ভরা হয়। মটকায় ভরার পর মুখ বন্ধ করে অন্তত দুই থেকে আড়াই মাস রেখে দেয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে চ্যাপা তৈরি হয়। পরে তৈরিকৃত চ্যাপা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করেন জহুর আলী। তার এই সফল উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এলাকার কর্মহীন মানুষের। পরিবারের অভাব ঘুচিয়ে স্বাবলম্বী হচ্ছেন তারা। ইয়াসিন মিয়া নামে এক শ্রমিক জানান, আমি এখানে অনেকদিন ধরে
কাজ করি। এখানে কাজ করে আমার পরিবারের খরচ মিটাই। চ্যাপা তৈরির উদ্যোক্তা জহুর আলী জানান, আমার বাবা চ্যাপার ব্যবসা করতেন। আমিও বাবার ব্যবসায় সহযোগিতা করতাম। ধীরে ধীরে চ্যাপা বানানো শিখে বাড়িতে চ্যাপা তৈরি শুরু করি। পরে ১৯৮৮ সালে উদ্যোগ নিয়ে দুই লাখ টাকা মূলধন নিয়ে একশ’ মটকায় চ্যাপা তৈরি শুরু করি। বর্তমানে আমার এখানে দেড় হাজার মটকায় সব ধরনের চ্যাপা তৈরি করা হচ্ছে। আমি অন্তত ৩৫ বছর ধরে চ্যাপা তৈরি করে আসছি। যা বছর ব্যাপী সারা দেশে পাইকারি বিক্রি করা হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চ্যাপা ব্যবসায়ীরা পাইকারী কিনে নিয়ে যায়।
ইউপি সদস্য আজিজুল হক বলেন, জহুল আলী একজন সফল উদ্যোক্তা। তার এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি এলাকার বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তার এই সফলতায় অন্যরাও আত্মকর্মশীল হতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন