অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থায় সততা, ন্যায্যতা এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে নতুন করে অভিবাসন নীতির পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন ফেডারেল সরকারের বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর এমপি। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সমস্ত ভিসা আবেদনের উপর সোশ্যাল মিডিয়া যাচাই চালু করা হবে। এই ঘোষণাটি একটি বৃহত্তর প্রস্তাবিত অভিবাসন নীতির প্রথম স্তম্ভ মাত্র এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ নতুন পরিকল্পনার ফলে বিপাকে পড়ছেন অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় আবেদনকারী বাংলাদেশিরা। অস্ট্রেলিয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়সহ বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শতশত বাংলাদেশি রাজনীতির সাথে জড়িত নাগরিকসহ অনেকে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন করেছেন। বর্তমানে যারা অস্ট্রেলিয়া রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন করছেন প্রায়জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে সূত্রে জানা গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার এক বক্তৃতায় ফেডারেল সরকারের বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর এমপি কোয়ালিশনের অভিবাসন নীতির প্রথম উপাদানগুলো প্রকাশ করেন। প্রকাশিত এ নতুন অভিবাসন নীতি অনুসারে, একটি জোট সরকারের অধীনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যাচাই এবং অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধ লঙ্ঘনকারীদের নির্বাসনের পরিকল্পনা চালু করা হবে। আমরা একটি স্পষ্ট বার্তা দেব যারা এখানে বেআইনিভাবে বা মিথ্যা অজুহাতে আসে তাদের নিপীড়নের ভুয়া দাবি কখনোই স্থায়ীত্বের পথ হতে পারে না বলে বিরোধীদলীয় নেতা জানান।
বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর বলেন, অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারের অংশ হিসেবে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া ৬৫,০০০ জন পর্যন্ত ব্যক্তিকে নির্বাসিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়া এবং সতর্ক করা হয়েছে যে, অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের পথগুলোকে “অপব্যবহার” করা হচ্ছে। তাদের এখনও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো একই ধরনের আন্তর্জাতিক মডেলগুলোতে ভারত, বাংলাদেশ, মরক্কো এবং তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোকে “নিরাপদ” বা ঝুঁকিমুক্ত দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, অভিবাসন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধকে স্থাপন করার মাধ্যমে লেবার পার্টির নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের মান উন্নত করবে এবং সংখ্যা হ্রাস করতে প্রথম ধাপে এ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরকার কোয়ালিশনের অভিবাসন নীতির অধীনে সোশ্যাল মিডিয়া যাচাই এবং একটি বাধ্যতামূলক মূল্যবোধের অঙ্গীকারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এই পরিকল্পনার একটি মূল অংশ হবে অস্ট্রেলিয়ান ভিসার জন্য আবেদনকারী প্রত্যেকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যালোচনা করা। যা যুক্তরাষ্ট্রে চালু করা ব্যবস্থার অনুরূপ।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের বিরোধী দলের নেতা অ্যাঙ্গাস টেলরের অভিবাসন পরিকল্পনার অধীনে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া এবং আশ্রয় প্রার্থীরা অস্ট্রেলিয়া থেকে নির্বাসনের মুখোমুখি হচ্ছেন বলে তিনি জানান। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একটি "নিরাপদ দেশ" তালিকা তৈরি করা হবে। ঐসব দেশ থেকে আসা "ভিত্তিহীন সুরক্ষা" আবেদনকারীদের আবেদন দ্রুত প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হতে হতে পারে। অর্থনৈতিক কারণে এখানে থাকার জন্য সুরক্ষা বা পড়াশোনার প্রয়োজনের মিথ্যা অজুহাত ব্যবহার করে লোকেরা আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার করছে।
বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলরের নীতি ঘোষণায় বলেন, একটি "এনহ্যান্সড স্ক্রিনিং কোঅর্ডিনেশন সেন্টার" প্রতিষ্ঠা করা হবে। যার তথ্য সংগ্রহ, আবেদন যাচাই এবং প্রয়োগ করার ক্ষমতা থাকবে গোয়েন্দা সংস্থা কাছে। এর কাজ হবে উগ্রপন্থী, চরমপন্থী এবং সন্ত্রাসীদের অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশে বাধা দেওয়া। এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে সন্ত্রাসী সহানুভূতিশীল এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগেই তাদের আবেদন বাতিল করা। উন্নততর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ভিসার জন্য আবেদন করার সময় সকল আবেদনকারীকে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট প্রদান করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিরোধী দলের নেতা।
অ্যাঙ্গাস টেলর বর্তমান পদ্ধতিকে একটি "আনুষ্ঠানিক নিয়ম পালন" বলে সমালোচনা করে বলেন, ভিসাধারী প্রত্যেকের জন্য এই বিবৃতিটিকে একটি বাধ্যতামূলক শর্ত মানতে হবে। যারা এই বিবৃতি লঙ্ঘন করবে তাদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা হবে। যদি কোনো ভিসাধারী অস্ট্রেলিয়ার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ণ করে এবং আইনকে অসম্মান করার প্রমাণ দেয় তাহলে তাকে অস্ট্রেলিয়া থেকে বের করে দেওয়া হবে। শক্তিশালী বিধিমালার মাধ্যমে আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোতে আর কোনো অস্পষ্টতা থাকবে না।অস্ট্রেলিয়ায় থাকার কোনো আইনি অধিকার নেই বলে জানানো সত্ত্বেও আপিলের এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে অস্বীকার করে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণদের আমরা সহ্য করব না। একটি প্রস্তাবিত যৌথ টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে ভিসার মেয়াদোত্তীর্ণদের লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং অস্থায়ী সুরক্ষা ভিসা পুনরুদ্ধার করবেন বলে বিরোধী দলের নেতা জানান।
অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস-এর ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় বৈদেশিক অভিবাসন (NOM) ২০২৩-২৪ সালের ৪২৯,০০০ থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালের জন্য প্রায় ৩০৬,০০০-এ দাঁড়িয়েছে। এবং আগামী তিন বছরে লেবার পার্টির বার্ষিক মনোনয়ন তালিকায় ২ লাখ ২৫ হাজার সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বলে জানা গেছে। এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত মূল্যবোধগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি সম্মান, আইনের শাসনের প্রতি অঙ্গীকার এবং সকলের জন্য একটি ন্যায্য সুযোগ। ভিসার জন্য আবেদনকারীদের বর্তমানে সতর্ক করা হয় যে, মূল্যবোধের বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতে ব্যর্থ হলে তাদের ভিসা আবেদন বিলম্বিত বা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।
স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক ছায়া মন্ত্রী সিনেটর জনো ডুনিয়াম বলেছেন, জোট সরকারের পরিকল্পনা প্রয়োগযোগ্য আইনের মাধ্যমে কারা এবং কী পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশ করবে তা বেছে নেওয়ার অধিকারকে শক্তিশালী করে। অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করা একটি বিশেষ সুযোগ কোনো অধিকার নয়। আমাদের এ পরিকল্পনা সীমান্তকে শক্তিশালী করবে, আমাদের ত্রুটিপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থাকে ঠিক করবে এবং অস্ট্রেলিয়াকে একটি নিরাপদ ও ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে নিশ্চিত করবে। ব্যবস্থার অপব্যবহারের দরজা বন্ধ করে এবং উগ্রপন্থীদের লাল সংকেত দিয়ে আমরা নিশ্চিত করছি আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থা সকল অস্ট্রেলীয়দের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করবে এবং যারা সঠিক পথে এখানে এসেছেন তাদের সমর্থন করবে। তিনি আরো বলেন, জোট সরকারের ‘অস্ট্রেলিয়ান ভ্যালুস মাইগ্রেশন প্ল্যান’-এর প্রথম কিস্তিতে তিনটি মূল পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কোয়ালিশনের 'অস্ট্রেলিয়ান ভ্যালুস মাইগ্রেশন প্ল্যান'-এর প্রথম কিস্তিতে তিনটি মূল পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ১৯৯৪ সালের অভিবাসন বিধিমালায় একটি সার্বজনীন ভিসার শর্ত হিসাবে 'অস্ট্রেলিয়ান ভ্যালুস স্টেটমেন্ট'-এর সাথে সম্মতিকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধকে প্রথমে এবং আমাদের অভিবাসন আইনের কেন্দ্রে স্থাপন করা। দ্বিতীয়টি হলো ভিত্তিহীন দাবি নিরুৎসাহিত করতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং অস্ট্রেলীয় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যবস্থার অপব্যবহারের পথ বন্ধ করা। এবং তৃতীয়টি হলো চরমপন্থীদের দেশে প্রবেশ আটকাতে স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া শক্তিশালী করার মাধ্যমে তাদের প্রতি সতর্ক সংকেত দেবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি উন্নত স্ক্রিনিং সমন্বয় কেন্দ্র স্থাপন করবে। এর ফলে ভিসা আবেদনকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রিনিং, যা প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুঁকির ভিত্তিতে করা হতো, তা যাচাই-বাছাইয়ের একটি আদর্শ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠবে। এএসআইও, এএফপি এবং অস্ট্রেলিয়ান বর্ডার ফোর্স সহ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে গোয়েন্দা এবং প্রয়োগকারী সক্ষমতা একীভূত করবে। অস্ট্রেলিয়ার জন্য হুমকিস্বরূপ ব্যক্তিদের শনাক্ত ও প্রতিহত করতে রিয়েল-টাইম, ঝুঁকি-ভিত্তিক ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা হবে। এই সংস্কারগুলো অভিবাসন ব্যবস্থায় অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের একটি বৃহত্তর কর্মসূচির সূচনা করে। আমাদের জীবনধারা রক্ষা করতে এবং অস্ট্রেলীয়দের জীবনযাত্রার মান পুনরুদ্ধার করতে আমাদের অবশ্যই অভিবাসীর সংখ্যা কমাতে হবে এবং অভিবাসনের মানদণ্ড উন্নত করতে হবে। অস্ট্রেলিয়ান ভ্যালুস মাইগ্রেশন প্ল্যানের অধীনে আরও পদক্ষেপ যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন বিষয়ক ছায়া মন্ত্রী সিনেটর জনো ডুনিয়াম জানান।
অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন নীতি অনুসারে সমস্ত ভিসা আবেদনকারীর সোশ্যাল মিডিয়া যাচাই করবে সরকার
আলমগীর হোসেন রুহেল ( অস্ট্রেলিয়া ) সিডনি থেকে
অনলাইন
১ মাস আগে
১৫ এপ্রিল (বুধবার), ২০২৬, ১ঃ৩৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
