পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সপ্তাহান্তের আলোচনায় তেহরানের পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে মতবিরোধই ছিল প্রধান অচলাবস্থা। ওয়াশিংটন তাদের প্রস্তাবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ বছরের জন্য স্থগিত করার কথা বলেছিল। কিন্তু তেহরান জানিয়েছে তারা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এতে সম্মত হতে পারে। এমন তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামাবাদ আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত করা নিয়ে দুই দেশ প্রস্তাব আদান-প্রদান করলেও চুক্তির মেয়াদ নিয়ে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। তেহরান সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের প্রস্তাব দেয়। যা ট্রাম্প প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করে ২০ বছরের ওপর জোর দেয়। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস দু’জন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও একজন মার্কিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে এ তথ্য জানায়।
এই অবস্থান ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আগের দাবির তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন, যেখানে তারা ইরানকে স্থায়ীভাবে অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। কারণ এটি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়ান ব্রেমার মনে করেন, মতবিরোধের মধ্যেও শেষ পর্যন্ত ১২ বছর ছয় মাসের একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সংলাপ এখনো চলছে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নিরসনে সপ্তাহান্তের এই বৈঠকটি ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। যদিও পারমাণবিক ইস্যুতে অচলাবস্থার কারণে ইসলামাবাদ আলোচনা শেষ হয়, কর্মকর্তারা জানিয়েছেন সংলাপ এখনো চালু আছে এবং শান্তিচুক্তির পথ এখনো খোলা রয়েছে। এর মধ্যেই সোমবার ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন সামরিক অবরোধ শুরু হয়েছে, যা প্রায় এক সপ্তাহের পুরোনো যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে কর্মকর্তারা জানান, সরাসরি আলোচনার দ্বিতীয় দফা আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, যদিও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ইসলামাবাদে কী ঘটেছিল
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ছাড়াও আলোচনার আরেকটি বড় ইস্যু ছিল হরমুজ প্রণালি, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ইরান কার্যত এটি বন্ধ করে রেখেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তা পুনরায় খুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয় বলে রয়টার্স জানিয়েছে। ইসলামাবাদের বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলের ভেতরে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় তিনটি অংশে। একটি মার্কিন দলের জন্য, একটি ইরানি দলের জন্য এবং একটি যৌথ বৈঠকের জন্য, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতা করে। প্রধান কক্ষে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ ছিল। ফলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফসহ প্রতিনিধিদের বিরতির সময় বাইরে গিয়ে নিজ নিজ দেশে বার্তা পাঠাতে হয়েছে। একজন পাকিস্তানি সরকারি সূত্র বলেন, আলোচনার মাঝামাঝি মনে হয়েছিল অগ্রগতি হবে এবং চুক্তি হতে পারে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা চলে। যখন নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়ে আলোচনা আসে, তখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির কণ্ঠস্বর কঠোর হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, আমরা কীভাবে আপনাদের বিশ্বাস করব, যখন জেনেভার আগের বৈঠকে আপনারা বলেছিলেন কূটনীতি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র হামলা করবে না?
উল্লেখ্য, জেনেভা বৈঠকের দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানে হামলা চালায়।
চুক্তির কাছাকাছি গিয়েও ভাঙন
সূত্রগুলো জানায়, হরমুজ প্রণালি, নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য ইস্যু ছাড়াও চুক্তির পরিধি নিয়েও মতবিরোধ ছিল। যুক্তরাষ্ট্র মূলত পারমাণবিক বিষয় ও হরমুজ প্রণালিতে গুরুত্ব দিলেও, ইরান একটি বিস্তৃত সমঝোতা চেয়েছিল। এক পর্যায়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আলোচনা কক্ষের বাইরে উচ্চস্বরে কথা শোনা যায়। পরে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চা-বিরতির ঘোষণা দিয়ে দুই পক্ষকে আলাদা কক্ষে নিয়ে যান।
আলোচনায় যুক্ত একটি সূত্র জানান, দুই পক্ষ খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল এবং প্রায় ৮০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তখনও নেয়া সম্ভব হয়নি। দু’জন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানান, পুরো পরিবেশ ছিল ভারী ও অমায়িক। পাকিস্তান পরিবেশ নরম করার চেষ্টা করলেও কোনো পক্ষই ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল না। তবে রোববার ভোরের দিকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যায় এবং আলোচনার সময় একদিন বাড়ানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
বিরোধের মূল কারণ
তবে মতপার্থক্য থেকেই যায়। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরান ঠিকভাবে বুঝতে পারেনি যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি চুক্তি করা, যাতে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। অন্যদিকে ইরানের বড় উদ্বেগ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যের ওপর অবিশ্বাস। এই প্রতিবেদনটি বৈঠকের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, পরিবেশের পরিবর্তন, আলোচনার সমাপ্তি এবং ভবিষ্যতে সংলাপের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
সামনে কী?
এই বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সোমবার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান ‘আজ সকালে যোগাযোগ করেছে’ এবং ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়।’ রয়টার্স এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানায়, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং চুক্তির দিকে অগ্রগতি চলছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেন, ইসলামাবাদ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একটুও পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আলোচক দল এই রেড লাইনসহ অন্যান্য শর্তে অটল রয়েছে। চুক্তির দিকে এগোতে যোগাযোগ অব্যাহত আছে।

<•~•>
১ মাস আগেPray to the Almighty, for He never takes you or your well-wishers to the United States, Canada, or any European countries. These countries are considered “living hells” for genuine, virtuous individuals. Only criminals and the most depraved individuals find solace there! Be proud to be a one and a united nation!