যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিচ্ছেন। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি তিনি বারবার বলেছেন, ইরানকে নিঃশর্তভাবে খুলে দিতে হবে। রবিবার সকালে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের সেরা মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা বের হওয়ার চেষ্টা করা যেকোনো জাহাজ অবরোধের প্রক্রিয়া শুরু করবে। একসময় আমরা এমন অবস্থায় পৌঁছাবো যেখানে সবাই অবাধে ঢুকতে ও বের হতে পারবে। কিন্তু ইরান তা হতে দিচ্ছে না।
ইরান তেলবাহী জাহাজ চলাচল সীমিত করায় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নির্ভরশীল অনেক দেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে এবং বিশ্বজুড়ে এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
তাহলে ট্রাম্প কেন এই অবরোধ চান?
প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ নয়। ইরান ধীরে ধীরে কিছু জাহাজকে যেতে দিচ্ছে। তবে প্রতি জাহাজে সর্বোচ্চ ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নিচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- ইরান নিজস্ব তেল রপ্তানি কিন্তু চালু রেখেছে। তথ্য ও বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত ইরান প্রতিদিন গড়ে ১৮.৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এই পরিমাণ আগের তিন মাসের তুলনায় বেশি। এই পরিস্থিতিতে পুরো প্রণালী বন্ধ করে দিলে ট্রাম্প ইরানের সরকারের একটি বড় আয়ের উৎস বন্ধ করে দিতে পারেন। এই আয় তাদের সামরিক কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করে।
কিন্তু ঝুঁকি কোথায়?
এই পদক্ষেপটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এ কারণেই এতদিন মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের তেলবাহী জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করেনি। অঞ্চল থেকে কিছু তেল বের হতে দিলে অন্তত দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। এমনকি মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সাময়িকভাবে তেল বিক্রির অনুমতিও দিয়েছিল। এসব তেল ট্যাংকারে জমা ছিল।
নিষেধাজ্ঞা ও নীতির দ্বন্দ্ব
যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়। তবে গত মাসে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সুযোগ তৈরি হয়- যা বিশ্বে প্রায় দেড় দিনের চাহিদা পূরণ করতে পারে বলে জানিয়েছে ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দিকটি ছিল জটিল। কারণ এতে ইরান তার তেল বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধের অর্থ জোগাড় করতে পেরেছে। তাছাড়া ইরান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের চেয়েও বেশি দামে তেল বিক্রি করে লাভবান হচ্ছিল।
তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা
জ্বালানির দাম বাড়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি হয়েছিল যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য। তাই তারা বিশ্বজুড়ে জরুরি তেলের মজুত ছাড়ার মতো পদক্ষেপ নেয়। এছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ তেলের ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যাতে বাজারে সরবরাহ বাড়ে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে।
এখনকার কৌশল
এখন ট্রাম্প নতুন একটি ঝুঁকি নিচ্ছেন হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরোধের হুমকি দিয়ে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন, যাতে তারা যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, একদিকে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে একই সঙ্গে ইরানের ওপর চাপ বাড়ানো- এই দুই কৌশলের মধ্যে ভারসাম্য রাখতেই এই জটিল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
