উন্নয়ন-সুশাসন নিশ্চিতে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য

উন্নয়ন-সুশাসন নিশ্চিতে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা অপরিহার্য

ফন্ট সাইজ:

একটি জেলার গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। দক্ষিণাঞ্চলের একটি সম্ভাবনাময় জেলা—যেখানে নদীর পাশে নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখিয়েছিল; স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থানের স্বপ্নও জেগেছিল। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই জটিলতা তৈরি হলো। জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করল। প্রশাসনের একাংশ নীরব, অন্য অংশ বিভক্ত—কে কার ঘনিষ্ঠ, কে কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত—এসব নিয়ে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। পুলিশের ভেতরেও দেখা দিল দ্বিধা; কেউ কঠোর ব্যবস্থা নিতে চাইলেও ‘ওপরের নির্দেশ’ কিংবা ‘অপ্রিয় হয়ে পড়ার’ আশঙ্কায় পিছিয়ে গেল।

ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো—প্রকল্পটি থমকে দাঁড়াল। বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে আগ্রহ হারালেন, শ্রমিকদের স্বপ্ন ভেঙে গেল, আর সেই সম্ভাবনাময় জেলা আবারও পিছিয়ে পড়ার চক্রে আবদ্ধ হলো। অথচ কয়েক মাস পরই পাশের আরেকটি জেলায় একই ধরনের একটি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়িত হলো—সেখানে প্রশাসন ছিল সমন্বিত, পুলিশ ছিল নিরপেক্ষ ও পেশাদার এবং আইন প্রয়োগ ছিল দৃঢ় কিন্তু ন্যায়সঙ্গত।

এই দু’টি ভিন্ন বাস্তবতার গল্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—উন্নয়ন কেবল পরিকল্পনার বিষয় নয়; বরং তা নির্ভর করে প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার ওপর।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুশাসন একে অপরের পরিপূরক—এ কথা নতুন নয়, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এই সত্যের গভীরতা বারবার নতুন করে অনুধাবন করতে হয়। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে তার প্রশাসনিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। বিশেষত জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী যদি পক্ষপাতদুষ্ট, বিভক্ত বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নের যেকোনো অর্জনই হয়ে ওঠে ভঙ্গুর ও অনিশ্চিত।

বর্তমান সরকার জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সরকারকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি—এসবই সরকারের অগ্রাধিকারের শীর্ষে অবস্থান করছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে জরুরি যে উপাদানটি প্রয়োজন, তা হলো একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো।

একটি দেশের মাইক্রো ও ম্যাক্রো অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; সেই নীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হয় মাঠ প্রশাসনের মাধ্যমে। বিনিয়োগকারীরা কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখেন না; তারা দেখতে চান বাস্তব নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা। আর এই আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষত পুলিশ। পুলিশ যদি নিরপেক্ষ ও পেশাদার হয়, তবে বিনিয়োগের পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই উন্নত হয়; অন্যথায় ভীতি, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ফলে বিনিয়োগ পিছিয়ে যায়। উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ভিত্তিতে পদায়ন ও পদোন্নতির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর ভেতরে ‘অদৃশ্য চক্র’ বা সিন্ডিকেটের সক্রিয়তা, গোষ্ঠীবাদ, এবং রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’-এর সংস্কৃতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, বাহিনীর কিছু অসাধু কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সহকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ‘ট্যাগ’ লাগানো, মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো এবং পদায়ন বা পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের ইঙ্গিত। এতে করে বাহিনীর ভেতরে ভীতি, অনিশ্চয়তা এবং অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে, যা পেশাদারিত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনপ্রশাসনেও একই রকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একটি দুর্নীতিগ্রস্ত চক্র নিজেদেরকে ‘বৈষম্যের শিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। তারা পূর্ববর্তী সরকারের আমলের সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তাকে সামনে এনে বর্তমান পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। যারা কিনা নিজেরাই ফ্যাসিবাদ আমলের সুবিধাভোগী বলে পরিচিত!

ফ্যাসিবাদ আমলের সুবিধাভোগী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা এখনো প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে কিছু কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে—যেমন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করে মন্ত্রণালয়ে তদবির করতে নিষেধাজ্ঞা। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ গ্রুপ নিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব নির্দেশনা কতটা কার্যকর হচ্ছে? যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি পরিবর্তন না হয়, তবে কেবল নির্দেশনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলেই আমি মনে করি।

এই সমস্যার শেকড় আরও গভীরে সামগ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির ভেতরে প্রোথিত। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে ‘নিজস্ব’ করে নেওয়ার প্রবণতা এ দেশে নতুন নয়। যে দলই ক্ষমতায় আসে, তারা নিজেদের অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে প্রশাসন সাজানোর চেষ্টা করে। এতে স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা মিললেও দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য যদি পদায়নের প্রধান মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তবে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকার নিজেই। অদক্ষ ও অনুগত কর্মকর্তাদের দ্বারা সরকারের একটি ক্ষুদ্র অংশ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সরকারের ভাবমূর্তি এবং জনপ্রিয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ অনুগত কর্মকর্তারা ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করেন । সেবার পরিবর্তে জনগণের উপর নিপীড়ন করেন। ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার ক্রমশ জন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন সরকার এই সত্য অনেক ক্ষেত্রেই বুঝতে ব্যর্থ হন। এবং এই ব্যর্থতাই শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’ গড়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার পূর্ণ প্রতিফলন এখনও দেখা যাচ্ছে না। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরোনো কাঠামোর পুনরাবৃত্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। মবের চাপ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যক্তিগত সুপারিশের ভিত্তিতে নিয়োগ ও বদলির ঘটনা প্রশাসনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে একটি ভীতিকর দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে—যেখানে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তাদের ভাগ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রথমত, প্রশাসন ও পুলিশকে সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। এটি কেবল নীতিগত ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে না পারে। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী পাবলিক সার্ভিস কমিশন, স্বচ্ছ পদায়ন প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, অপপ্রচার বা গোষ্ঠীবাদ—যে কোনো ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে, তা সে যত উচ্চপদস্থই হোক না কেন। একই সঙ্গে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের জন্য একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে তারা নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন।

তৃতীয়ত, পেশাদারিত্বের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসনের মূল ভিত্তি হলো নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা। বাংলাদেশকেও সেই পথে এগোতে হবে, যদি আমরা একটি টেকসই উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে চাই।

পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, রাষ্ট্রের শক্তি তার প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তির ওপর নির্ভর করে। জনপ্রশাসন ও পুলিশ যদি নিজেদের ভেতরেই বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে বাহ্যিক কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হবে না। তাই এখনই সময়—অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান জোরদার করা, গোষ্ঠীবাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এবং সর্বোপরি একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
কারণ, উন্নয়নের আসল ভিত্তি শুধু অবকাঠামো নয়—বরং শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ন্যায্যতা, শৃঙ্খলা ও বিশ্বাস। আর সেই ভিত্তি নির্মাণের মূল শর্তই হলো—জনপ্রশাসন ও পুলিশের নিরপেক্ষতা।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন