বাংলার ধূসর মাটি আর ঘামঝরা কৃষকের গল্পে এখন নতুন অধ্যায় যোগ করছে স্মার্টফোন। মাটির চিরন্তন ঘ্রাণ আর সিলিকন চিপের মিতালিতে গড়ে উঠছে আমাদের আগামীর স্মার্ট কৃষি, যেখানে কৃষকরা এখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে আঙুলের ছোঁয়ায় মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের আগাম বার্তা জেনে নিচ্ছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (২০২৪) এর তথ্যমতে, দেশের ৪১ শতাংশ শ্রমশক্তি এবং জিডিপিতে ১১.৬৬ শতাংশ অবদান রাখা কৃষিখাতই জাতীয় অর্থনীতির মূল ভিত্তি। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অবহেলার অন্ধকারে রেখে জাতীয় সমৃদ্ধি ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভব যা অনুধাবন করেই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তার ১৯ দফা ও ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার প্রথম সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
আজকের চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে শহীদ জিয়ার সেই উৎপাদনমুখী চিন্তার আধুনিক সংস্করণই হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ভিশন স্মার্ট কৃষি। এটি কেবল যান্ত্রিক প্রদর্শনী নয় বরং একটি বৈষম্যহীন ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা কৃষি, যেখানে ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেয়া হবে। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো ডিজিটাল ডাটাবেজ ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার ও বীজের ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের মোবাইল ওয়ালেটে পৌঁছে দেয়া এবং ই কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেট ভেঙে কৃষকের ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তির সাথে দেশপ্রেমের এই মেলবন্ধনই হবে সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রধান স্তম্ভ।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কৃষি কেবল জীবনধারণের মাধ্যম নয় বরং এটি একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক খাত। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা ‘ভিশন ২০৩০’-এ কৃষিখাতকে একটি আধুনিক শিল্প হিসেবে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি প্রদানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বিএনপি মনে করে, কৃষিকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়া হলে এই খাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়বে এবং কৃষকরা শিল্পোদ্যোক্তার মতো রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
এই ভিশনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষা নিশ্চিত করে বিশেষায়িত কৃষি শিল্প অঞ্চল বা ‘এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ প্রতিষ্ঠা করা। দেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে এই জোনগুলো স্থাপিত হবে, যেখানে কৃষিপণ্য সরাসরি সংগ্রহের পর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রক্রিয়াজাত করা হবে। এর ফলে পচনশীল পণ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষক তার ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে। বিএনপির এই দর্শনের মূলে রয়েছে উৎপাদনমুখী রাজনীতির সেই চেতনা যা কৃষি ও শিল্পকে একসূত্রে গেঁথে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে দিতে সক্ষম।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়কাল থেকেই সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল বিএনপির কৃষি রাজনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। তৎকালীন খাল খনন কর্মসূচি মূলত ভূ উপরিস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে সেচ বিপ্লব ঘটিয়েছিল। বর্তমান সময়ে সেই ঐতিহ্যবাহী দর্শনকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সমন্বয় করে স্মার্ট সেচ পদ্ধতির প্রস্তাব করা হয়। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো প্রচলিত ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থার ব্যাপক বিস্তার ঘটানো। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষকের জ্বালানি খরচ আমূল হ্রাস পাবে অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি আধুনিক ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কৃষিতে ড্রোনের ব্যবহারকে একটি বিশেষ বিপ্লব হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে বিশাল এলাকার ফসলি জমি অত্যন্ত অল্প সময়ে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব যা রোগবালাই শনাক্তকরণ এবং সুনির্দিষ্টভাবে কীটনাশক ও সার ছিটানোর কাজে ব্যবহৃত হবে। এর ফলে অপচয় কমবে এবং বিষাক্ত রাসায়নিকের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে কৃষকের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষা পাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং আইওটি প্রযুক্তিকে কৃষি নীতিতে একটি সমন্বিত শক্তি হিসেবে দেখা হয়। মাটির গভীরে বসানো আইওটি সেন্সরের মাধ্যমে রিয়েল টাইম তথ্য সরাসরি কৃষকের স্মার্টফোনে পৌঁছে যাবে যার ফলে কৃষক বুঝতে পারবেন কখন জমিতে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সার বা পানি প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে পশুপালন এবং মৎস্য খাতের অবদান অনস্বীকার্য। স্মার্ট পশুপালন ব্যবস্থাপনার আওতায় সরকারিভাবে প্রতিটি গবাদি পশুর জন্য ডিজিটাল আইডেন্টিফিকেশন বা ট্যাগিং সিস্টেম প্রবর্তন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্যগত তথ্য, টিকাদান কর্মসূচি এবং ব্রিডিং রেকর্ড একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। আইওটি ভিত্তিক স্মার্ট সেন্সর ব্যবহার করে পশুর শারীরিক অবস্থা মনিটর করা হবে।
মৎস্য খাতের আধুনিকায়নে আইওটি ভিত্তিক ওয়াটার কোয়ালিটি মনিটরিং সিস্টেম জনপ্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। পুকুর বা ঘেরের পানির তাপমাত্রা, অম্লত্ব (pH) এবং অক্সিজেনের মাত্রা সেন্সরের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া আরএএস (RAS) প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে অল্প জায়গায় অধিক মাছ চাষ নিশ্চিত করা হবে। শহীদ জিয়ার স্বনির্ভরতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই সাশ্রয়ী ও উচ্চফলনশীল প্রযুক্তিগুলো প্রান্তিক চাষিদের নাগালে পৌঁছে দেয়া অত্যন্ত জরুরি।
কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয় বরং উৎপাদিত ফসল ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত সতেজ ও মানসম্মত অবস্থায় পৌঁছানো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সঠিক সংরক্ষণের অভাবে ফসলের অপচয় রোধে উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হিমাগার এবং বহুমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের মহাপরিকল্পনা বিএনপির ভিশনে রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সার্টিফিকেশন ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং পণ্যের গায়ে কিউআর (QR) কোড ভিত্তিক লেবেলিং যুক্ত করা হবে। এর ফলে একজন ক্রেতা স্মার্টফোনের মাধ্যমেই পণ্যের উৎস এবং এতে কোনো ক্ষতিকর রাসায়নিক আছে কি না তা সহজেই যাচাই করতে পারবেন।
পাশাপাশি পরিবর্তিত জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল বিশেষ জাতের বীজ উদ্ভাবন ও বিস্তারে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হবে। কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বাধ্যতামূলক ‘শস্য বীমা’ প্রকল্প চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হলে ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছাড়াই বীমার টাকা সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে প্রদানের ডিজিটাল ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে সুরক্ষা দেবে।
কৃষিখাতে আমূল পরিবর্তন আনতে উপকরণ সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা বিএনপির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। সার, বীজ ও বিদ্যুৎসহ যাবতীয় কৃষি সহায়তায় বিদ্যমান দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে প্রতিটি প্রকৃত কৃষকের জন্য স্মার্ট ‘কৃষক কার্ড’ ইস্যু করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি ভর্তুকির টাকা কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই সরাসরি কৃষকের ব্যাংক বা মোবাইল অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে।
একইভাবে কৃষকের পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এবং ভোক্তা পর্যায়ে সিন্ডিকেট ভাঙতে একটি জাতীয় ডিজিটাল এগ্রি-মার্কেটপ্লেস বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে কৃষক সরাসরি বড় খুচরা বিক্রেতা ও রপ্তানিকারকদের সাথে যুক্ত হতে পারবেন। এই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ব্লকচেইন ও ট্রেসেবিলিটি সিস্টেম প্রয়োগ করা হবে যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য রুখে দিয়ে প্রান্তিক চাষিদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোতে আধুনিক টেস্টিং ল্যাবরেটরি ও প্যাকিং ফ্যাসিলিটি স্থাপন করা হবে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের আম, শাকসবজি এবং মৎস্য পণ্যের জন্য বিশেষ 'এক্সপোর্ট করিডোর' তৈরি করা হবে। রপ্তানি বাণিজ্যে স্থায়িত্ব আনতে বাংলাদেশি জিআই (GI) পণ্যের আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর মান অনুযায়ী 'গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস' (GAP) সার্টিফিকেট প্রদান প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল করা হবে।
স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের পথে গ্রামীণ পর্যায়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধার অপ্রতুলতা বড় বাধা। এছাড়া প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ডিজিটাল বিভাজন বা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। বর্তমান সরকার মনে করে, কেবল প্রযুক্তি আনলেই হবে না বরং সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা সাধারণ কৃষকের নাগালে থাকতে হবে। উত্তরণের পথ হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যায়ে সুলভ মূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হবে। প্রযুক্তির উচ্চমূল্য বিবেচনা করে সরকারি উদ্যোগে ‘কমিউনিটি বেজড টেকনোলজি শেয়ারিং’ মডেল চালু করা হবে যার ফলে ক্ষুদ্র কৃষকরা সমবায়ের মাধ্যমে আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
পরিশেষে, ‘স্মার্ট কৃষি’ কেবল একটি আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয় বরং এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির সেই স্বনির্ভর চেতনারই এক উন্নত ডিজিটাল সংস্করণ। এই দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তির সহায়তায় কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। তৃণমূলের প্রান্তিক মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার মাধ্যমেই একটি জাতির প্রকৃত সার্বভৌমত্ব রক্ষিত হয়। স্মার্ট কৃষি বাস্তবায়নের এই লড়াই সফল হলে বাংলাদেশ কেবল খাদ্যে আত্মনির্ভরশীলই হবে না বরং একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। প্রযুক্তির সাথে দেশপ্রেমের এই মেলবন্ধনই শহীদ জিয়ার স্বপ্নের সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার মূল ভিত্তি।
লেখক: গবেষক ও শিক্ষক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

Ripon
২ মাস আগেExcellent write-up sir. I believe it will contribute to the development of future agriculture in Bangladesh. Thank you