আমার স্বামী মোঃ নজরুল ইসলাম বিডিআর হাসপাতাল পিলখানায় মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকান্ড দেখে প্রাণের ভয়ে সে ওয়াল টপকে বের হয়ে যায়। পরে, কেরানীগঞ্জে সে তার এক আত্মীয়ের বাসায় যায়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে আমার স্বামী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী নেয়। পরে জানতে পারি যে আমার স্বামী তার আসল নাম গোপন করে নুরুল আমীন মুন্সী নাম ধারণ করে মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী করছে। কিন্তু আমার স্বামীর শেষ রক্ষা হয়নি। সে বিডিআর হত্যাকান্ড স্বচক্ষে দেখার কারনে তাকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী দিয়েছেন মুন্নী আক্তার নামের এই প্রাইভেট টিউটর (শিক্ষিকা)। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলায় তিনি এ সাক্ষ্য দিয়েছেন। এদিন মুন্নী আক্তারের সাক্ষ্যর জবনবন্দি দেয়ার পরে তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তবে, জেরা শেষ না হওয়ায় পরবর্তী জেরার জন্য আগামি ১৬ই এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার বলেন, আমি বাসায় বাসায় প্রাইভেট পড়াই। আমার স্বামী মোঃ নজরুল ইসলাম বিডিআর হাসপাতাল পিলখানায় মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকান্ড দেখে প্রাণের ভয়ে সে ওয়াল টপকে বের হয়ে যায়। কেরানীগঞ্জে সে তার এক আত্মীয়ের বাসায় যায়। সেখান থেকে ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ হয়। তখন আমরা পীলখানা ১ নং গেইটের সামনে একটা বাসায় থাকতাম। সেখান থেকে আমি আমার কাকির বাসা পোস্তগোলায় চলে যাই। সেখান থেকে আমার মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে আমার স্বামীর নিকট যাই। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর মেয়েকে নিয়ে ঝালকাঠি বাবার বাড়িতে চলে যাই।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তীতে ২০১০ সালে সে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী নেয়। সেখান ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ করে এবং স্টাফ কোয়ার্টারে একটি বাসা ভাড়া নেয়। সেখানে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে সেখানে চলে যাই। সেখানে গিয়ে আমি জানতে পারি যে আমার স্বামী তার আসল নাম গোপন করে নুরুল আমীন মুন্সী নাম ধারণ করে মধুমতি ক্লিনিকে চাকুরী করছে। সে প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত ডিউটি করতো। কিন্তু সে বছরের ১৫ই মার্চে সে ডিউটিতে গিয়ে আর বাসায় ফেরত আসেনি। বিষয়টি আমি তার ছোট ভাই মোহাইমিনুল ইসলামকে জানাই। ঐ দিন রাতে আমার স্বামী বাসায় না ফেরায় পরদিন সকাল বেলা আমি আমার মেয়েকে নিয়ে মধুমতি ক্লিনিকে যাই। জনৈক রুহুল আমীন শেখ আমার স্বামীর সাথে কাজ করতো। আমি জানতে পারি সে হাসপাতালে ভর্তি আছে। আমি হাসপাতালে গিয়ে তাকে আমার স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করি। সে তখন বলে ১৫ তারিখ রাতে কোটালীপাড়া বামতার মোড় এলাকায় সাদা পোশাকে ৫/৬ জন লোক আমার স্বামীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় এবং তাকে মারধর করে সেখানে ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে আমার ভাসুর গিয়াস উদ্দীন আমাদের কাছে আসে। তিনি আমাদেরকে ১৭ তারিখ কোটালীপাড়া থানায় নিয়ে যায় এবং আমি আমার স্বামীর অপহরণের বিষয়ে একটি মামলা করি। তারপর আমি আমার শ্বশুর বাড়ীতে চলে যাই।
জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার আরও বলেন, এ ঘটনার পরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন আমাদের বাড়িতে আসতো। একদিন ঝালকাঠি থেকে ডিএসবির লোক এসে আমার শ্বশুরকে বলে আমার স্বামী নজরুল ইসলামের লাশ বাঘেরহাট শরণখোলা বলেশ্বর নদী থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। আমার শ্বশুর বিষয়টি তার অন্যান্য ছেলেদের জানায়। আমার দেবর জাহিদুল ইসলাম শাহীন বিডিআরে চাকুরী করতো। সে পত্রিকায় আমার স্বামীর লাশের ছবি দেখতে পেয়ে তা শনাক্ত করে। আমার দেবর আমার স্বামীর পরিহিত পোশাকের বর্ণনা আমার কাছে জানতে চায়। আমি আত্মীয়-স্বজনসহ শরণখোলা থানায় গিয়ে আমার স্বামীর পরিধেয় পোশাক শনাক্ত করি। পুলিশের কাছে লাশ ফেরত চাইলে পুলিশ জানায় আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আমার স্বামীর লাশ দাফন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার পর আমার স্বামীর লাশ কবর থেকে তুলে বাড়িতে এনে পুনরায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করি। পরবর্তীতে জানতে পারি যে র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান আসামী জিয়াউল আহসান আমার স্বামীকে গুম করে হত্যা করেছে। তবে এ কথায় আপত্তি জানায় আসামি জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা। পরে মুন্নী আক্তার তার স্বামীর গুম ও হত্যার বিচার চান।
এসময় যে ছবি দেখে নজরুল ইসলামের ছোট ভাই তাকে শনাক্ত করেছিলেন তার একটি কপি তদন্তকারী কর্মকার্তাকে দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। পরে তা ট্রাইবুনালে দাখিল করেন। এ সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। প্রদর্শিত ছবিতে দেখা যায় নজরুল ইসলামের হাত-পা বাঁধা, চোখ বাঁধা ও মাথায় জমটুপি পরানো, পেট কাটা, নাড়িভূড়ি বের হওয়া, মুখ বিকৃত অবস্থায় ছিলো।
