টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ

যুক্তরাষ্ট্র না পারলে অন্যরা হরমুজ প্রণালি উদ্ধার করতে পারবে এটা পাগলামি

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের যুদ্ধ ষষ্ঠ সপ্তাহে প্রবেশ করার পর, তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালিকে একটি অস্ত্রে পরিণত করেছে। মার্চের শুরু থেকে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপস নেভি ‘অনুমতিভিত্তিক’ চলাচল ব্যবস্থা চালু করেছে। চীন, পাকিস্তান, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের কিছু তেলবাহী জাহাজকে যেতে দেয়া হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে টোল আদায়ের প্রমাণ মিলছে। ফলাফল হিসেবে, বৈশ্বিক তেল পরিবহন ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। শুধু তেল নয়- গ্যাস, রাসায়নিক, সার এবং কন্টেইনারবাহী জাহাজও আটকে পড়েছে। প্রায় ৩০০-৪০০ জাহাজ প্রণালির কাছে অবস্থান করছে। বিলম্বিত বা ঘুরিয়ে দেয়া জাহাজ ধরলে সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এখন হুতি আন্দোলনও এই সংঘাতে যোগ দিয়েছে- এটা হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। ২৮শে মার্চ তারা দক্ষিণ ইসরাইলের দিকে এই যুদ্ধের প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এরপর আরও হামলা হয়। গত ১৮ মাসের লোহিত সাগরের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, হুতিরা সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে দক্ষ। তারা ঠিক ততটুকু আঘাত করে, যতটা তাদের লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন, তার বেশি নয়। তেহরান, যেখানে এই কৌশল তৈরি হয়েছে, সেটাও ভালোভাবেই জানে।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমরা সব ধ্বংস করে দিচ্ছি’ বা ‘পাথরযুগে ফিরিয়ে দিচ্ছি’ বা ‘এক রাতেই একটি সভ্যতার মৃত্যু ঘটবে’ এ ধরনের ভাষা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না এবং সহায়কও নয়। এতে মনে হয় যেন কোনো পুরনো ধাঁচের ফ্রন্টলাইন আছে, যেটা জোর করে দখল করা যাবে। বাস্তবে এখানে হাজার হাজার মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদিন মাত্র কয়েকটি টিকে থাকলেই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সম্ভব। এগুলো ধ্বংস করা ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অত্যন্ত কঠিন। ইরান যদি নিজে থেকেই প্রণালিতে হস্তক্ষেপ বন্ধ করে, অথবা চীন তাকে তা করতে বাধ্য করেÑ এই দুটি পথই সবচেয়ে ভালো সমাধান হতে পারে। যদিও বর্তমানে দুটিই অসম্ভবের মতো মনে হচ্ছে। তৃতীয় পথ হলো জোর করে ইরানকে থামানো, তাও সমানভাবে কল্পনা করা কঠিন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই তার বক্তব্যে ‘পিছু হটার পথ’ খোলা রেখেছেন এবং এখন আমরা দেখছি তিনি বারবার বলছেন ‘যাদের দরকার তারা যেন এটি (হরমুজ প্রণালি) খুলে দেয়।’ এসব বিষয় বৈশ্বিক তেলবাজার কীভাবে কাজ করে, সে সম্পর্কে অজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে রয়েছে আক্রমণের হুমকি বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ-এর বিরুদ্ধে, যা ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। তবে আমার মতে, এই ধরনের অভিযানের জন্য যে পরিমাণ স্থলবাহিনী দরকার, তা এখনো সেখানে মোতায়েন করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু সেরা ইউনিট- এয়ারবোর্ন ও মেরিন সেখানে থাকলেও, বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি এখনো স্পষ্ট নয়। ইউএসএস বক্সার এবং তার সঙ্গে থাকা মেরিন বাহিনী পথে থাকলেও, তারা সর্বশেষ আল্টিমেটামের সময়সীমার অনেক পরে পৌঁছাবে।
আর যদি ট্রাম্প মেরিনদের অবতরণ জাহাজ নিয়ে উপসাগরে পাঠান এবং খার্গ দ্বীপে হুমকি তৈরি করেন, তাহলে ‘ইরান কি প্রণালিতে মাইন বসিয়েছে কিনা’- এই প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গেই মিলবে। প্রণালির কাছাকাছি ছোট দ্বীপ দখল করা সামরিকভাবে সহজ হতে পারে, কিন্তু তার প্রভাবও কম হবে।
এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে রয়েছে বৃটেনের নেতৃত্বে গঠিত নতুন জোট। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপানসহ ৩৫টি দেশ এই সপ্তাহে লন্ডনে একত্রিত হয়েছে। লক্ষ্য একটাই: কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা। এটি স্পষ্টভাবে কোনো সামরিক জোট নয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধেও যোগ দিচ্ছে না। বৃটেন শুরু থেকেই পরিষ্কার করেছে যে, তারা ইরানের ওপর বোমা হামলায় অংশ নেবে না। তারা প্রতিরক্ষামূলক বিমান পরিচালনা করছে এবং টাইপ ৪৫ ডেস্ট্রয়ার পাঠিয়েছে। পাশাপাশি আরএফএ লিয়াম’কে প্রস্তুত করছে, যা প্রয়োজনে উদ্ধার অভিযান বা মাইন অনুসন্ধান জাহাজ হিসেবে কাজ করবে।
তবুও একটি সত্য রয়ে গেছে। যদি ইরান গুলি চালানো এবং প্রণালি নিয়ন্ত্রণ বন্ধ না করে, তাহলে সম্মিলিতভাবেও আমরা খুব কমই করতে পারবো। মার্কিন নৌবাহিনী যেখানে এখনো চেষ্টা করেনি, সেখানে বিভিন্ন দেশের মাঝারি সক্ষমতার যুদ্ধজাহাজ একত্রে সফল হবেÑ এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তবে কূটনৈতিক উদ্যোগকে চলতে দেয়া উচিত। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং এখানে বৃটেনের নেতৃত্ব রয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকট তৈরি করাই যথেষ্ট ছিল না, এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ন্যাটো ভেঙে দেয়ার কথাও বলছেন। কারণ হিসেবে তিনি দেখাচ্ছেন, তার যুদ্ধে অন্যরা যোগ দেয়নি। এটি ন্যাটোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং ৯/১১-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের প্রতি অবমাননা। এদিকে রাশিয়া ও চীনের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা নিশ্চয়ই এই পরিস্থিতি দেখে সন্তুষ্ট। কারণ তারা নিজেরাও এর চেয়ে ভালোভাবে পরিস্থিতি তৈরি করতে পারতো না।
হরমুজ প্রণালিতে আমরা এখন এমন এক অবস্থায় আটকে আছি, যার নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে এবং কোনো পরিমাণ বোমাবর্ষণ তা পরিবর্তন করতে পারবে না। এখান থেকে সরে আসাও বিপজ্জনক হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিশ্বাস নষ্ট হবে, সামুদ্রিক নিয়ম ভেঙে পড়বে এবং ইরান আর্থিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যাতে তারা তাদের অস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করতে পারে।
সবশেষে, কূটনীতি ও প্রভাব বিস্তারই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এখানে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বৃটেন নেতৃত্বাধীন জোটও তার ভূমিকা রাখবে। আশাবাদী হওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ সব অর্থনৈতিক সূচকই বলছে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, এমনকি বিপর্যয়কর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
(লেখক ২৭ বছর রয়েল নেভিতে কাজ করেছেন এবং চারটি যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক ছিলেন। অনলাইন টেলিগ্রাফ থেকে তার লেখার অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন