তৈরি বৃটিশের হাত ধরে। শত বছর আগে। এই রুটের কোনো পরিবর্তন হয়নি। সংস্কার কাজ হয়েছে। রেলপথের অনেক কিছুরই বয়স একশ’ বছর উপরে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আর ভার নিতে পারছে না এই রুট। এ কারণে ব্রিজ, পথ দুটোই হয়ে পড়েছে ভয়ঙ্কর। ফলাফল তো চোখেই দেখা যাচ্ছে। বারবার লাইনচ্যুত হচ্ছে রেল। দুঘর্টনাও এড়ানো যাচ্ছে না। অথচ এই রুট নিয়ে কয়েকবার পরিকল্পনা হয়েছে। বিগত সরকারের সময় সিলেট থেকে আখাড়াউড়া পর্যন্ত রেললাইনকে ডাবল লাইন করার প্রস্তাব উঠেছিল। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছিল মিটার গেজ লাইনকে ব্রডগেজ লাইনে রূপান্তর করা হবে। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ শুরু করে রেলপথের সব উন্নয়ন পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত এমপিদের প্রতিশ্রুতিতে ছিল রেললাইনের উন্নতি করা। সিলেট থেকে ঢাকা রেললাইন বলা হলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন রেললাইন হওয়ার কারণে দূরত্ব আগের চেয়ে অনেক কমেছে। এটি এখন দাঁড়িয়েছে সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত। আখাউড়া থেকে ঢাকা যেতে কোনো ঝামেলাই হয় না। নতুন রেলপথ হওয়ার কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আখাউড়া থেকে সিলেটের রেল ঢাকায় পৌঁছতে পারে। যত সমস্যা হচ্ছে সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথ নিয়ে। এর দূরত্ব প্রায় ১৮০ কিলোমিটার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিলেট-আখাউড়া সেকশনে প্রায় আড়াইশ’ রেলসেতু রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই বৃটিশ সময়ে তৈরি করা। এ রুটের ১৩টি সেতু ‘মহাঝুঁঁকিপূর্ণ’ বা ‘ডেড স্টপ’ হিসেবে চিহ্নিত। এসব সেতুর উপর দিয়ে ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার গতিতে ট্র্রেন চলাচল করতে হচ্ছে। সেকশনটিতে প্রায় ১০০টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সেতু রয়েছে। সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হয়। এ ছাড়া সিলেট-চট্টগ্রাম ও সিলেট-ঢাকা রুটের সবক’টি ট্রেনের ইঞ্জিন দুর্বল হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের পুরনো ইঞ্জিন দিয়ে চালানো হচ্ছে ট্রেন। ট্রেনের স্বাভাবিক গতি যেখানে ৭০-৮০ কিলোমিটার সেখানে দুর্বল ইঞ্জিন ও জরাজীর্ণ লাইনের কারণে ঘণ্টায় ৪০-৫০ কিলোমিটার গতিতে চালাতে হচ্ছে ট্রেন। সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের পাহাড়ি ও আঁকাবাঁকা ভূপ্রকৃতি এবং জরাজীর্ণ লাইনের কারণে বেশ কিছু এলাকা অত্যন্ত দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত। এ কারণে অনেক সময় পাহাড়ি এলাকা দিয়ে ট্রেন যাওয়ার সময় গতিহীন হয়ে পড়ে। দুর্গমস্থানে যাত্রীসহ গতিহীন হয়ে পড়া ট্রেন নিয়ে শঙ্কায় পড়েন যাত্রীরা। কখনো কখনো নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন তারা। এদিকে হবিগঞ্জের রশিদপুর থেকে সিলেটের মাইজগাঁও পর্যন্ত অংশটি এই রুটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। এ ছাড়া দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা হিসেবে কুলাউড়ার বরমচাল, শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও, কমলগঞ্জের শমসেরনগর, ভানুগাছ, ফেঞ্চুগঞ্জের ইলাশপুর, মল্লিকপুরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রেন ও লাইন জরাজীর্ণ হওয়ার কারণে সিলেট-ঢাকা রেলপথ এখন যাত্রীদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কপথ এখনো স্বস্তিদায়ক হয়নি। নতুন করে সড়ক নির্মাণকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ রুটে ভোগান্তি কমবে না। এরই মধ্যে রেলপথও আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করেছে। পরিসংখ্যান বলছে- ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সিলেট-আখাউড়া সেকশনে ছোট-বড় অন্তত ২০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ডিরেইলমেন্ট বা বগি লাইনচ্যূতির ঘটনা ঘটেছে ৫টি এবং অপারেশনাল দুর্ঘটনা ঘটেছে ১২টি। গত বুধবার রাতে হবিগঞ্জের মাধবপুরে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা তেলের ওয়াগনবাহী রেল লাইনচ্যূত হয়। এতে ঢাকার সঙ্গে সিলেটের ১৮ ঘণ্টা রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক নুরুল ইসলাম জানান, সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেললাইন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে বারবার দুঘর্টনা ঘটছে। এবারের দুঘর্টনার পর যাত্রী ভোগান্তি কমাতে সরকার থেকে একটি বিশেষ ট্রেন দেয়া হয়েছে। আমেরিকান প্রবাসী সাংবাদিক খলকু কামাল বলেন, ঢাকা-সিলেট ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের দাবি অনেক আগে থেকেই জানানো হচ্ছে। এ নিয়ে বারবারই সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু বিগত সরকার বিষয়টি কানেই তোলেনি। এটি আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।
তিনি বলেন, সিলেট থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথ ডাবল লাইন করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে সেটি করা হলে সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন তিনি। এদিকে উন্নয়নের বিষয়টি সবসময়ই সিলেটের মন্ত্রী ও এমপিদের ওপর নির্ভর করে। এবারো তার ব্যতিক্রম নয়। নির্বাচনের সময় সিলেটের রেলপথসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আধুনিকায়নসহ নানা বিষয় নির্বাচনী ইশতেহারে তুলে ধরেছিলেন সিলেট-১ আসনের এমপি ও পাট, বস্ত্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এরই মধ্যে ঢাকা-সিলেট রেলপথ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) হুমায়ূন কবির। রমজানে সিলেটের একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ঢাকা-সিলেট রেললাইন নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। এটি খুব দ্রুততম সময়ে করা হবে বলে আশ্বাস করেন। তবে এখনো এ লাইন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়নি।
ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকা সিলেট রেলপথ
ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
৫ এপ্রিল (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
