শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অগ্রাধিকার, গবেষণা মানোন্নয়নে জোর

সাক্ষাৎকারে ঢাবি ভিসি ওবায়দুল ইসলাম

শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অগ্রাধিকার, গবেষণা মানোন্নয়নে জোর

ফন্ট সাইজ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পরই শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে গবেষণার পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার মান বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেয়ার ওপর গুরুত্বআরোপ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১তম ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) ভিসি অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে বাউবি’র ভিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ভিশন সম্পর্কে তিনি বলেন, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে শিক্ষকতা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে বিভিন্ন বডিতেও কাজ করেছি, রুট লেভেলসহ সকল পর্যায়ে। আমরা সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি ভালো ও উচ্চ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য সোচ্চার ছিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের যা কিছু সুন্দর, যা কিছু অর্জন, যা কিছু ভালো তার সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা আছে। অতএব, এই বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা অনেক বেশি ভালোবাসি। গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার মান, র?্যাঙ্কিং এবং বিশ্বমানের গবেষণা সব ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়কে উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়েই আমি কাজ করছি এবং বর্তমানে যে দায়িত্ব পেয়েছি, তা বাস্তবায়নের জন্য আমার প্রাণান্ত চেষ্টা থাকবে।
ঢাবি ভিসি বলেন, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের একটু ভালো রাখা। আমরা দীর্ঘ সময় অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছি। প্রতিকূল পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় পথ চলেছে। আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, আগামী দিনে যদি বৈষম্য থেকে যায়, তবে বিশ্ববিদ্যালয় আবার পথ হারাবে। অতএব, আমরা যেন বৈষম্যহীনভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারি। আমাদের আর্থিক সমস্যা আছে আমাদের আবাসন সমস্যা আছে আধুনিক ফ্যাসিলিটি এখনো আমরা শুরু করতে পারিনি। শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধার জন্য আমি কাজ করবো এবং বিগত সময়কালের যে সমস্ত উদ্যোগ আছে সেগুলো এগিয়ে নিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের আর্থিক অপূর্ণতা আছে কেননা যে পরিমাণ বাজেট আমরা পাই তা অপ্রতুল। আমরা গবেষণা যদি করতে চাই তাহলে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আমাদের একাডেমিয়ার যোগাযোগ থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য যে পরিবেশ সেটিকে আধুনিক করা। স্মার্ট ইন্টারনেট সেবা দেয়া। সর্বোপরি তাদের থাকা এবং খাওয়া এই দুটো পরিবেশ উন্নত করতে পারলেই তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারবো। শিক্ষার্থীরাই আমার সব, শিক্ষার্থীরা আছে বলেই প্রতিষ্ঠান টিকে থাকে। তারা আছে বলে আমরা আছি। তাদের সেবাই হলো বর্তমান চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, একাডেমিক মান বলতে আমরা মূলত শিক্ষা ও গবেষণাকে বুঝি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত ধারণা শুধু ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট প্রদান নয়; বরং জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা পরিচালনা এবং সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘টিচিং’ এবং ‘রিসার্চ’ এই দুইটি মৌলিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়াতে হয়। এ ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। যদি আমরা শিক্ষাদান এবং গবেষণা উভয়ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে পারি, তাহলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান শক্তিশালী করা সম্ভব। বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়েও এই দুইটি বিষয়ই প্রধান প্যারামিটার হিসেবে কাজ করে। আর একজন ভিসি’র পক্ষে একা সবকিছু করা সম্ভব নয়। এটি একটি টিমওয়ার্কের বিষয়। ভিসি’র ভূমিকা মূলত সমন্বয় করা, দিকনির্দেশনা দেয়া এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা বা ফ্যাসিলিটি নিশ্চিত করা। শিক্ষক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন প্রশাসনিক সংস্থা সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। আমি একটি সমন্বিত টিম গঠন করে শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়নে কাজ শুরু করার চেষ্টা করছি।
ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনীতি নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয় বরং রাজনীতি সমাজ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাজনীতি ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। গত সময়ের ঘটনাপ্রবাহ এবং পরিবর্তনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি অনেক আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও একটি বড় জনসংখ্যার দেশে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা রাজনীতি নিয়ে একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। রাজনীতিতে একটা গুণগত উন্নতি হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরাও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত ও সচেতন। তারা গণতান্ত্রিক চর্চা ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তারা ২০২৪ এর আন্দোলন করেছে। তাদের এই অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া জরুরি এবং কোনোভাবেই তা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। সবশেষে, রাজনীতিকে যদি ব্যক্তি স্বার্থের বাইরে রেখে সমাজ পরিবর্তনের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং এর নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করা যায় তাহলে আমরা আরও স্থিতিশীল ও উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে পারবো।
ক্যাম্পাসে ‘মব’ সংস্কৃতির বিষয়ে অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মব সংস্কৃতি আসলে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ফল। তখনকার সরকার বা প্রশাসন হয়তো সেভাবে নজর দিতে পারেনি। আমি বলবো ভালনারেবল সরকার ছিল। আসলে এখন রাজনৈতিক সরকার না হলে যেটা হয় তাই হয়েছে। আলোচনার টেবিলে বসে নেগোসিয়েশন করাই সবচেয়ে ভালো পলিসি। রাস্তা বন্ধ করে বা নৈরাজ্য তৈরি করে কোনো সমাধান আসে না। আমরা শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা চাইবো। এখন তো হলে হলে সংসদ (ডাকসু) থাকবে, তারা তাদের সমস্যার কথা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাবে।
ডাকসু নির্বাচন কি নিয়মিত হবে? জবাবে তিনি বলেন, আমি সবসময় সিনেট বা বিভিন্ন ফোরামে শিক্ষার্থীদের সুবিধা ও ডাকসুর পক্ষে কথা বলেছি। এমনকি আমি সিনেট থেকে ওয়াক আউট করেছি শিক্ষার্থীদের পক্ষে আমার নানা বক্তব্য এখনো রেকর্ড আছে। সেই আমিই এখন দায়িত্ব পেয়েছি। আমার সেই অবস্থান এখনো বজায় আছে। আমি অবশ্যই ডাকসু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে চাই এবং সব পক্ষকে নিয়ে কাজ করতে চাই।
আরেক প্রশ্নের জবাবে ঢাবি ভিসি বলেন, রাজনীতি সমাজ পরিবর্তন করে এবং মানুষকে পরোপকারী করে তোলে। তবে আমি যখন এই চেয়ারে বসেছি, তখন আমি একজন একাডেমিক এবং নিরপেক্ষ ব্যক্তি। আমার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু আমি দলাদলি-দলবাজি করবো না। বর্তমান সরকারও চেয়েছে আমি যেন একজন সার্বজনীন হই। অর্থাৎ আমার দলীয় পরিচয়ের কোনো নেতিবাচক প্রভাব বা রিফ্লেকশন যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে না পড়ে। আমি সবাইকে নিয়ে কাজ করবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন