একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধ্বংস করতে সবসময় যুদ্ধ লাগে না; কখনো কখনো নীরব লুটপাটই যথেষ্ট। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে, যেখানে উন্নয়নের ভাষ্য সামনে থাকলেও অন্তরালে চলেছে ভয়াবহ অর্থ পাচারের মহোৎসব। পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের আমলে যে পরিমাণ অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচিত—তা শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা লুট হয়ে যাওয়ার নির্মম প্রতিচ্ছবি।
এই পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার—এমন এক বিশাল অঙ্ক, যা দিয়ে বাংলাদেশের মতো একটি দেশের চার বছরের বাজেট নির্বাহ করা সম্ভব। অর্থাৎ, কোনো ধরনের বৈদেশিক ঋণ বা অভ্যন্তরীণ চাপ ছাড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি হতো এই অর্থ দিয়েই। শুধু তাই নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক পদ্মা সেতু-এর মতো প্রকল্প হাজারবার বাস্তবায়ন করা যেত এই অর্থ দিয়ে।
অথচ বাস্তবতা হলো—এই বিপুল সম্পদ দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় না হয়ে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, গড়ে উঠেছে বেগমপাড়া, বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, অফশোর সম্পদের সাম্রাজ্য।
এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষণগুলোতেও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পুনর্গঠনের এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ঘাটতি বা বাজেট ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আস্থার সংকট, সুশাসনের সংকট এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সংকট।
এমন এক পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন জাতীয় সংসদে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন, তখন তা নিঃসন্দেহে আশার আলো জাগায়। তিনি জানিয়েছেন, পাচারের গন্তব্য হিসেবে ১০টি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের সঙ্গে পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তির (MLA) বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স এবং দুর্নীতি দমন কমিশন-এর সমন্বয়ে যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে যায় যে—কেন এত বছর ধরে এই পাচার চলতে পারল? প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরেই দুর্নীতির শিকড় গেঁড়ে বসেছিল। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং, ব্যাংকিং খাতের দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহার—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত দুর্নীতির ইকোসিস্টেম তৈরি হয়েছিল। এই ব্যবস্থায় দুর্নীতিবাজ আমলা, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা—সবকিছু এক সুতোয় গাঁথা ছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই লুটপাট ছিল অনেকাংশেই ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত’। অর্থাৎ, এটি বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; বরং একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা, যেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে—কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ করা হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতর থেকেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে, যা একটি দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ নয়—এটি একটি রাজনৈতিক ও নৈতিক যুদ্ধ। কারণ, এই অর্থের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক এবং জটিল আইনি কাঠামো। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদি, জটিল এবং কখনো কখনো কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল একটি প্রক্রিয়া।
তাই সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় করণীয় হলো—এই ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। শুধু বক্তব্যে নয়, বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, দক্ষ আইনজীবী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, বিদেশে সম্পদ শনাক্তকরণে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার—এসব পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করতে হবে।
একই সঙ্গে, ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সেজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, বৈদেশিক বাণিজ্যে ডিজিটাল নজরদারি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি—এসব নিশ্চিত না করলে পাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—দুর্নীতির সংস্কৃতি ভাঙা। কারণ, সরকার পরিবর্তন হলেও যদি মানসিকতা পরিবর্তন না হয়, তাহলে একই চক্র নতুন রূপে ফিরে আসবে। ইতোমধ্যে এমন অনেক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, অতীতের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীগুলো এখনও সক্রিয় এবং সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
এই বাস্তবতায় ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’—এই নীতিটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যতে পাচার বন্ধ করা।
পরিশেষে বলা যায়, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা শুধু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রশ্ন নয়—এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রশ্ন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সর্বোপরি—দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান।
কারণ, এই লড়াই কেবল অর্থ ফেরত আনার নয়—এটি একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠনের লড়াই। সুতরাং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে এই লড়াইয়ে জিততেই হবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ই-মেইল: [email protected]
পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে প্রয়োজন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
৪ এপ্রিল (শনিবার), ২০২৬, ১২ঃ১৮ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
