রপ্তানি আয় কমায় বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ

রপ্তানি আয় কমায় বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ

ফন্ট সাইজ:

সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে দেশে রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। অন্যদিকে রপ্তানি আয় কমার বিপরীতে আমদানির ব্যয় বেড়েই চলেছে। দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতির চাপ বাড়ছে। ওদিকে সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে রপ্তানি আয় হ্রাস অব্যাহত আছে। গত মাসে ১৮.০৭ শতাংশ কমে ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৪.২৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬ এর জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মোট রপ্তানি আয় ৪.৮৫ শতাংশ কমে ৩৫.৩৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যেখানে গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৩৭.১৯ বিলিয়ন ডলার। এ নিয়ে টানা আট মাস রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। বৃহস্পতিবার রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশেষ করে গত রমজানকে ঘিরে ভোজ্য তেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছিল, যার কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। অন্যদিকে, রপ্তানি কমে গেছে। এমন অবস্থায় খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই ধারাবাহিক বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এই খাতে রপ্তানি আয় ৫.৫১ শতাংশ কমে ২৮.৫৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৩০.২৪ বিলিয়ন ডলার।
রপ্তানির সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইপিবি জানায়, চলতি অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় দেশের অধিকাংশ প্রধান রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। তবে হিমায়িত ও জীবিত মাছ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্রকৌশল পণ্য খাত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা সামগ্রিক রপ্তানি খাতে কিছুটা ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে।

ইপিবি উল্লেখ করেছে, সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতি বিভিন্ন বৈশ্বিক বাহ্যিক প্রভাবের কারণে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংশ্লিষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানি আদেশ স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে জানায় সংস্থাটি।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পাল্টা শুল্ক আরোপের পর থেকে প্রথমে যুক্তরাষ্ট্র ও তারপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ কমেছে। ফলে কয়েক মাস ধরেই রপ্তানি কম হচ্ছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বিওপি) হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) দেশের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৭৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে তিন হাজার ৯৮৮ কোটি (৩৯.৮৮ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৬ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি হয়েছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য।

অন্যদিকে, আলোচিত সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৬.০৯ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ১.১ শতাংশ কম। আগের অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানি আয় ছিল ২৬.৩৭ বিলিয়ন ডলার। আমদানি ও রপ্তানির এই ব্যবধানের কারণেই চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি বেড়েছে।
চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সেই হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। কিন্তু দেশে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স এখন সামান্য ঋণাত্মক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরে জানুয়ারি শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরে একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৩২ কোটি ডলার।

সামগ্রিক লেনদেনে (ওভারঅল ব্যালান্স) ভালো অবস্থায় আছে বাংলাদেশ। আলোচিত সময়ে সামগ্রিক লেনদেনের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২৮৩ কোটি ডলার। এই সূচকটি আগের বছর একই সময়ে ১২২ কোটি ডলার ঘাটতিতে (ঋণাত্মক) ছিল। সামগ্রিক লেনদেনে স্বস্তি থাকলেও শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। আলোচিত সময়ে বাজার থেকে প্রায় ১২ কোটি ডলার চলে গেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে প্রবাসীরা ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছর পাঠিয়েছিলেন এক হাজার ৫৯৬ কোটি ডলার। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ২১.৮ শতাংশ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন