আইনের শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গানোর চেষ্টা অতঃপর...

আইনের শাসনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙ্গানোর চেষ্টা অতঃপর...

ফন্ট সাইজ:

একটি ছোট গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। শহরের এক কোণে এক তরুণ উদ্যোক্তা ঈদ উপলক্ষে নিজের সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে একটি অস্থায়ী দোকান বসালেন। উদ্দেশ্য—অল্প লাভে বেশি বিক্রি, আর সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। কিন্তু হঠাৎ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এসে তাকে থামিয়ে দিলেন। অভিযোগ—তিনি বাজার নষ্ট করছেন। যুক্তি—এভাবে কম দামে বিক্রি করলে অন্য ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হবে। আর সেই কথার আড়ালে উচ্চারিত হলো এক অদৃশ্য ভয়—“উপরের লোকদের” নাম।

এই গল্পটি কল্পনা নয়; এটি আমাদের সমাজের দীর্ঘদিনের এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তবে এবার গল্পটির শেষটা একটু ভিন্ন। কারণ, এবার আদালত নীরব থাকেনি—আইন কথা বলতে শুরু করেছে। যা নতুন দিনের সূচনা বলেই মনে হচ্ছে।

রাজধানীর মগবাজারে ‘নবীন ফ্যাশন’-এর একটি দোকান বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি তাই কেবল একটি ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, আইন, ক্ষমতা এবং ন্যায্যতার এক জটিল সমীকরণের প্রতিফলন। যেখানে দেখা গেছে—প্রধানমন্ত্রীর 'আত্মীয়' ও ঘনিষ্ঠ 'বন্ধু' পরিচয় দিয়ে কিছু ব্যক্তি এক নবীন উদ্যোক্তার ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে।

কারণ তারা নবীন ফ্যাশনকে বলেছিল ১৫ শ' টাকায় পাজামা এবং ৪৫০০ টাকার নিচে কোনো পাঞ্জাবি বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু নবীন ফ্যাশন বিক্রি করছিল মাত্র ৩০০ টাকা করে।

এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে সিন্ডিকেট কতটা ভয়ংকর ডাকাতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারা দিনের আলোয় প্রশাসনের সামনে মানুষের পকেট কেটে নিচ্ছে।

ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যত দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
এজন্য তদন্ত সাপেক্ষে হাতিরঝিল থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে আমাকে নিশ্চিত করেছেন তেজগাঁও বিভাগের ডিসি মোঃ ইবনে মিজান।
এখন আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে ডিএমপি সদর দপ্তর।
নবীন ফ্যাশনের “অপরাধ” ছিল—তিনি ঈদ উপলক্ষে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে পাঞ্জাবি-পাজামা বিক্রি করছিলেন।

বিশ্বের যেকোনো সভ্য দেশে উৎসব মানেই ছাড়, সহমর্মিতা এবং ক্রেতা-বান্ধব উদ্যোগ। বড়দিনে ইউরোপ-আমেরিকায়, দীপাবলিতে ভারতে, এমনকি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ নয় এমন দেশেও ঈদে ব্যাপক ছাড় দেওয়া হয়। কারণ উৎসব কেবল আনন্দের নয়—এটি অর্থনীতিকে মানবিক করার একটি সময়।

কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন উল্টো। রমজান এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অকারণে বেড়ে যায়, ঈদ সামনে এলেই পোশাকের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা যায়। যেন উৎসব মানেই কিছু গোষ্ঠীর জন্য অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের সুযোগ।

এই অস্বাভাবিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেট কেবল বাজার নিয়ন্ত্রণ করে না—এটি প্রভাব, ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—যেখানে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বাজারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। নতুন উদ্যোক্তা, বিশেষ করে যারা ভিন্ন কিছু করতে চায়, তারা প্রায়ই এই চক্রের শিকার হয়।

নবীন ফ্যাশনের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যারা নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিচয় দিয়ে দাপট দেখিয়েছিল, তারা শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বরং আদালত নিজ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে তলব করেছে, ব্যাখ্যা চেয়েছে এবং ঘটনার দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—ক্ষমতার নামে অপব্যবহার আর আগের মতো মোটেও সহজ নয়।

ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি—এটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো আইন রক্ষা করা, প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষা করা নয়। কিন্তু বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়—ক্ষমতার ছায়া পুলিশকে নিরপেক্ষ ভূমিকা থেকে বিচ্যুত করে।

এই প্রেক্ষাপটে আদালতের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ওসি গোলাম মর্তুজা আদালতে হাজির হয়ে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি একটি বার্তা—জবাবদিহিতা শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা সমালোচনা রয়েছে—ধীরগতি, প্রভাব, এবং সীমাবদ্ধতা নিয়ে। কিন্তু এই ঘটনায় আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোকান খুলে দেওয়ার নির্দেশ, ওসিকে তলব, রাষ্ট্রপক্ষের মতামত চাওয়া—এসব পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে বিচারব্যবস্থা চাইলে দ্রুত এবং কার্যকর হতে পারে।

এটি অনেক অন্ধকারের শেষে এক ফোঁটা আলোর মতো—যা মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করছে।

“আমি অমুকের লোক”, “আমি তমুকের আত্মীয়”—এই ধরনের পরিচয় ব্যবহার করে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। এটি একটি সামাজিক রোগে পরিণত হয়েছে।
এই রোগের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি আইনের শাসনকে দুর্বল করে দেয়। যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আইন সবার জন্য সমান নয়, তখন রাষ্ট্রের ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
নবীন ফ্যাশনের ঘটনাটি দেখিয়েছে—এই সংস্কৃতিকে চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব।

একটি রাষ্ট্র তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। পতিত স্বৈরাচার আমলের ব্যক্তি-নির্ভর শাসন কখনো দীর্ঘস্থায়ী সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ও কার্যকর করার প্রচেষ্টা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শুরু থেকেই এই বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে—যাতে প্রশাসন, পুলিশ, আদালত—সব প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে।

নবীন ফ্যাশনের ঘটনাটি সেই প্রচেষ্টার একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে। এখানে সরকারপ্রধানের নাম ব্যবহার করা হলেও, শেষ পর্যন্ত আইনই কথা বলেছে। এজন্য আমি সরকার প্রধান তারেক রহমানকে বিশেষভাবে সাধুবাদ জানাতে চাই।

নবীন ফ্যাশনের এই ঘটনাকে নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক সূচনা বলা যায়। কিন্তু এটিই শেষ নয়—বরং শুরু।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে যে ক্ষমতার দাপট, সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিদ্যমান, তা একদিনে দূর হবে না।

তবে পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া—আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রশাসনের জবাবদিহিতা।
বিচারব্যবস্থার সক্রিয়তা।
এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

একজন সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না—সে চায় ন্যায্য দাম, নিরাপত্তা এবং সম্মান। নবীন ফ্যাশনের মতো উদ্যোগগুলো সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন। যারা কম দামে ভালো পণ্য দিতে চায়, তারা আসলে বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার জন্যই লাভজনক।
সুতরাং এমন উদ্যোগকে দমন করা মানে কেবল একজন ব্যবসায়ীকে নয়—সমাজের সম্ভাবনাকেই দমন করা। জনস্বার্থকে সরাসরি আঘাত করা।

পরিশেষে বলতে চাই, মগবাজারের একটি ছোট দোকান হয়তো রাষ্ট্রের বৃহৎ চিত্রে খুব বড় কিছু নয়। কিন্তু এই ছোট ঘটনাই একটি বড় বার্তা বহন করে—আইনের শাসন ধীরে ধীরে হলেও মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে, যদি প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে একইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে একদিন হয়তো আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে পাব—
যেখানে কোনো “পরিচয়” আইনের ঊর্ধ্বে নয়, যেখানে পুলিশ দর্শক নয়, রক্ষক,
যেখানে আদালত নীরব নয়, সক্রিয়,
এবং যেখানে একজন নবীন উদ্যোক্তার স্বপ্ন কোনো সিন্ডিকেটের চাপে ভেঙে পড়ে না।

এই পথ দীর্ঘ, চ্যালেঞ্জপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটি পরিবর্তন শুরু হয় একটি ছোট পদক্ষেপ দিয়ে। নবীন ফ্যাশনের ঘটনাটি সেই পদক্ষেপগুলোর একটি—যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যতই গভীর হোক, আলো একদিন পথ দেখাবেই। আর আমাদের প্রধানমন্ত্রী তথা একজন জিয়াউর রহমান এবং একজন খালেদা জিয়ার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমানই হোক সেই আলো ও পথের দিশারী।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]

মোঃ আতাউর রহমান

২ মাস আগে

হুমকি দাতারা আইন অনুযায়ী গ্রেফতার হওয়া উচিত ছিল কিন্তু হয় নাই। কাজেই সরকারকে সাধুবাদ জানানোর কিছু নাই।

Mohsin

২ মাস আগে

নবীন ফ্যাশনের বিরুদ্ধে সিণ্ডিকেট ব্যবসায়রা পুলিশের ছত্রছায়ায় যে-ধরনের ন্যকারজনক ঘটনা ঘটাইয়াছেন তাহা সভ্য সমাজের জন্য অত্যন্ত অপমান জনক সুতরাং মলের ভিতর মব সৃষ্টিকারী দের বিরুদ্ধে আইনের মাধ্যমে কঠোর সাজা দিতে হবে না হয় অদূর ভবিষ্যতে নতুন ব্যবসায়রা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা থেকে বিরত থাকিবে।

মন্তব্য করুন