মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় প্রাচীন মহাকাব্য ‘মহাভারত' পড়েছেন বলে মনে হয় না। পশ্চিমা সংস্কৃতির মানুষ ট্রাম্পের পক্ষে প্রাচ্য দেশের কাহিনী না জানারই কথা। ‘মহাভারত' পড়লে তিনি জানতেন, গল্পগুলো আসলে যুদ্ধের কাহিনী। এমন এক যুদ্ধ, যেখানে কেউই বিজয়ী হয় না। ‘মহাভারত'-এর ভীষ্মপর্বে বর্ণিত যুদ্ধের দৃশ্য এক চিরন্তনী প্রতিচ্ছবি উপস্থাপন করেছে: ‘রণভূমি রক্তে পূর্ণ, গজ অশ্ব রথে রথে সংঘর্ষ প্রবল, শরের বর্ষণে আকাশ অন্ধকার হইল। রক্তস্রোতে ভাসিল ভূমি, কেশ, ধনু, তূণ ও অস্ত্রে ভরিল যুদ্ধক্ষেত্র’।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে নিয়ে ইরানে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছিলেন বীরদর্পে। তার ঘোষণা অনুযায়ী, ইরানে চার সপ্তাহের একটি দ্রুত অভিযান হওয়ার কথা ছিল। কথা ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ভেঙে দেয়া এবং শাসন পরিবর্তনে বাধ্য করার। কিন্তু পাঁচ সপ্তাহ পার হওয়ার পর হোয়াইট হাউস এখন এমন এক সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে, যা তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে এনেছে। তাই ব্যয়বহুল যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। অর্থনৈতিক ক্ষতিতে উদ্বিগ্ন হোয়াইট হাউস।
ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউসের পিছু হটা যুদ্ধের ধ্বংস ও মানবিকতা থেকে নয়। আর্থিক কারণে। নিজের মুখ রক্ষায়। অনেকের আশংকা, ভিয়েতনামে, আফগানিস্তানে, ইরাকে যেমন হয়েছে, তেমন হতে চলছে ইরানের ক্ষেত্রে। এমনকি, ইরান আক্রমণ মার্কিনীদের জন্য আরো মারাত্মক হবে। দেশ হিসাবে ইরান বড়। জাতি হিসাবে সংঘবদ্ধ। ইরানপন্থীরা মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বন্ধু ও সহযোগী তৈরি করেছে, যারা সশস্ত্র ও দক্ষ। ফলে চারদিক থেকে আক্রান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক ক্ষতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের আর্থিক লোকসান।
তাই, যুদ্ধ শুরু করলেই হয় না। পরিণতি নিয়ে ভাবতে হয়। ভাবনা-চিন্তার সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য ইতিহাস বোধ থাকা দরকার। ট্রাম্প ‘মহাভারত' পড়লেন হয়ত এমন যুদ্ধে ছুটে যেতেন না। ইতিহাসবোধের অনুপস্থিতির কারণেই তিনি যুদ্ধের নামে আক্রমণের উন্মাদনা সৃষ্টি করে পাল্টা জবাব পেয়ে পিছু হটছেন।
মহাভারতের যুদ্ধদর্শন
যুদ্ধের ইতিহাস কেবল বিজয়ের কাহিনী নয়। এটি মূলত মানবিক বিপর্যয়ের ধারাবাহিক দলিল। প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য ‘মহাভারত' এই সত্যকে গভীরভাবে ধারণ করে। বিশেষত ভীষ্মপর্বে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এমন এক সর্বনাশা বাস্তবতার প্রতীক, যেখানে জয়-পরাজয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। এই মহাকাব্যের কেন্দ্রীয় শিক্ষা হলো—যুদ্ধের পরিণতিতে প্রকৃত বিজয়ী কেউ থাকে না; থাকে কেবল ধ্বংস, অনুশোচনা ও নৈতিক সংকট।
মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠার নামে সংঘটিত এক মহাবিনাশ। কিন্তু যুদ্ধ শেষে পাণ্ডবদের অর্জন ছিল শূন্যতার রাজত্ব—স্বজনহারা এক ক্ষমতা। ভীষ্মের শরশয্যা, অভিমন্যুর নির্মম মৃত্যু, দ্রৌপদীর অপমান—এসবই দেখায় যে ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুদ্ধও শেষ পর্যন্ত মানবিক ক্ষতির সীমা অতিক্রম করে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক প্রশ্ন উঠে আসে: ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ (Just War) কি আদৌ সম্ভব? আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে যেমন “Just War Theory” আলোচিত হয়, মহাভারত তার এক প্রাচীন রূপক ব্যাখ্যা দেয়। যুদ্ধের উদ্দেশ্য নৈতিক হলেও, তার প্রক্রিয়া ও ফলাফল প্রায়শই অনৈতিকতায় পরিণত হয়।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি: বাস্তবতা বনাম বিভ্রম
ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক যুদ্ধকৌশল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইতিহাসের কিছু মৌলিক শিক্ষা উপেক্ষিত হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সীমিত সময়ের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা ছিল মূলত একটি “quick victory illusion” বা দ্রুত বিজয়ের প্রলোভন—যা আধুনিক যুদ্ধনীতির একটি বড় ভ্রান্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা—ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান—প্রমাণ করে যে, দ্রুত বিজয়ের ধারণা প্রায়শই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে পরিণত হয়। উদাহরণ স্বরূপ, ভিয়েতনামে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরাজয় ঘটে। আফগানিস্তানে ২০ বছরের যুদ্ধ শেষে তালেবানদের হাতে দেশটিকে ছেড়ে দিয়ে পরাজয় এগিয়ে কোনক্রমে পিছু হটতে হয়। ইরাকে শাসন পরিবর্তনের পর দীর্ঘমেয়াদি বিশৃঙ্খলার এখনো টানতে হচ্ছে মার্কিনীদের। এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত করে যে, যুদ্ধের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করলেও কৌশলগত স্থিতিশীলতা অর্জন প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে।
ইরান প্রসঙ্গ: ভৌগোলিক ও কৌশলগত বাস্তবতা
ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল, আরও কঠিন। কয়েকটি মৌলিক কারণ এখানে প্রাসঙ্গিক। যেমন, প্রথমেই আসে ভূ-রাজনৈতিক গভীরতার বিষয়টি। ইরান ভৌগোলিকভাবে বৃহৎ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষত হরমুজ প্রণালী, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান পথ। দেশটির রয়েছে ব্যাপক আঞ্চলিক প্রভাব। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী রয়েছে, যা যুদ্ধকে বহুমাত্রিক করে তোলে। জাতি হিসাবে শিয়া মতাবলম্বী ইরানিদের জাতীয় সংহতি প্রবল। বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে ইরানি সমাজ ঐতিহাসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওঠে। এসব কারণে ইরান সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি প্রক্সি যুদ্ধ ও গেরিলা কৌশল ব্যবহার করতে সক্ষম। ফলে একটি সীমিত যুদ্ধ দ্রুতই আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকর।
অর্থনীতি বনাম মানবিকতা: পিছু হটার বাস্তব কারণ
ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য পিছু হটার পেছনে মানবিক বিবেচনা নয়, বরং অর্থনৈতিক চাপ একটি বড় কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। যুদ্ধের ব্যয় তাদেরকে কাবু করছে। সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হচ্ছে। লজিস্টিক সাপোর্ট বা সরবরাহ চেইন ভেঙে যাচ্ছে। তাছাড়া, এ যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে ইরানে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করে।
এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতা স্পষ্ট। তা হলো, যুদ্ধে সামরিক বিজয় অর্থনৈতিক পরাজয়ে রূপ নিতে পারে। মহাভারতের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছে। যেখানে “বিজয়” আসলে পরাজয়ের আরেক রূপ হয়ে দাঁড়ায়।
ইতিহাসবোধের সংকট: মহাভারত থেকে ট্রাম্প
মহাত্মা গান্ধি একবার বলেছিলেন, “History repeats itself because we fail to learn from it.” ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন। যদি তিনি মহাভারতের মতো মহাকাব্যের অন্তর্নিহিত শিক্ষা উপলব্ধি করতেন, তাহলে হয়তো যুদ্ধকে কেবল শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখতেন না।
ট্রাম্প মহাভারত পড়লে কয়েকটি মৌলিক সত্য ও ঐতিহাসিক বিচারবোধ সম্পর্কে শিখতে পারতেন। যেমন: ১.যুদ্ধ শুরু করা সহজ, শেষ করা কঠিন। ২.শত্রুকে পরাজিত করা সম্ভব, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতি পূরণ অসম্ভব। ৩. রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নৈতিক দায় এড়ানো যায় না।
ইতিহাসবোধের সংকট থেকে অতীতের যুদ্ধবাজরা যেমন রক্ষা পায়নি। ট্রাম্প বা ভবিষ্যতের যুদ্ধবাদী নেতৃত্বও পাবে না। নেতাদের তাই ইতিহাসবোধের অনুপস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য সর্বদা সতর্ক ও সচেতন থাকতে হয়।
যুদ্ধের উন্মাদনা বনাম মানবতার ভবিষ্যৎ
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধের আহ্বান প্রায়শই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনের একটি হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইতিহাস, সাহিত্য ও বাস্তবতা—তিনটিই একই বার্তা দেয়: যুদ্ধ কখনোই টেকসই সমাধান নয়।
ট্রাম্প যদি মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপ সম্পর্কে পড়তেন, তাহলে হয়তো বুঝতে পারতেন—যুদ্ধ কেবল শত্রুকে ধ্বংস করে না, নিজেকেও ক্ষতবিক্ষত করে।
অতএব, রাষ্ট্রনেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো: যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইতিহাসকে পড়তে হয়, বুঝতে হয়, বাস্তবতা জানতে হয়। এবং যুদ্ধের চরম পরিণতির সম্পর্কে জেনে যুদ্ধের ময়দানে পা বাড়াতে হয়। যদি তা না করা হয়, তাহলে বার বার ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তানের গ্লানি এসে ঘিরে ধরবে।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
