তীব্র প্রতিক্রিয়ায় পাঁচদিনের মাথায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়া মো. আব্দুর রশিদ মিয়ার নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। গত রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তার নিয়োগ আদেশ বাতিল করে। এর আগে গত ২৪শে মার্চ আব্দুর রশিদ মিয়াকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ইতিপূর্বে তিনি এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্বে ছিলেন। পিআরএলে যাওয়ার পর তাকে এক বছরের জন্য প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তবে বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অভ্যন্তরে। ‘দুর্নীতির মিয়া ভাই’ খ্যাত এই কর্মকর্তার একাধিক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা আব্দুর রশিদ মিয়াকে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়ায় বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সদ্য অবসরকালীন ছুটিতে যাওয়া এলজিইডি’র এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, চাকরি জীবনে দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত আব্দুর রশিদ মিয়া একটি গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কোনো ক্রাইটেরিয়ায় জনগুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।
সূত্র মতে, মো. আব্দুর রশিদ মিয়া চাকরি জীবনে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে গড়েছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
তার অবৈধ অর্থে অর্জিত সম্পদের মধ্যে রয়েছে, বগুড়ার শেরপুর পৌরসভায় জমি, হিমছায়াপুরে বাগানবাড়ী, একই এলাকায় ১০ নম্বর শাহবন্দেগী ইউনিয়নে খন্দকার তলা মৌজায় ৫ একর জমি, বগুড়ার শেরপুর সেরমিয়া মৌজায় ১২ বিঘা জমি, রাজশাহীতে ৫ ও ৭ তলা দু’টি বাড়ি, একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সিরাজগঞ্জে হাটিকুমরুল এলাকায় ২৫ শতাংশ জমির ওপর ফুডগার্ডেন, সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কে আরও একটি ফুডগার্ডেন। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংকে কোটি টাকার বেশি এফডিআর ও রাজধানীতে একাধিক বেনামি ফ্ল্যাট।
ইতিমধ্যে অনুসন্ধান পর্যায়ে অনেক অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও আব্দুর রশিদ মিয়া তদন্ত কাজে শুরু থেকেই চরম অসহযোগিতা করে গেছেন কমিশনকে। বেশ কিছু নথিপত্রসহ পরপর তিনবার তাকে তলবি নোটিশ দেয়া হলেও কোনো সাড়া দেননি। তার কাছে চাওয়া নথিপত্র সরবরাহ করেননি আব্দুর রশিদ মিয়া।
জানা যায়, এলজিইডিতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার দুর্নীতি তদন্তের স্বার্থে গত বছরের ১৫ই মে শেরেবাংলা নগর থানার মাধ্যমে তলবি নোটিশ পাঠিয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মানসী বিশ্বাস। ওই চিঠিতেও ফুটে উঠেছে দুদককে অসহযোগিতার চিত্র। শেরেবাংলা নগর থানা সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে। ওই তলবি নোটিশ মূলত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আগারগাঁও এলজিইডি ভবন বরাবর পাঠানো হয়েছে। চতুর্থবার পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য গত গত বছরের ১০ই এপ্রিল, ১৬ই এপ্রিল ও ২রা মে নোটিশ প্রেরণ করা হলেও চাহিদাকৃত কোনো রেকর্ডপত্র সরবরাহ করা হয়নি কিংবা উপস্থিত হয়ে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি।
এ বিষয়ে দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী (তৎকালীন চলতি দায়িত্ব) আব্দুর রশিদ মিয়াকে বারবার তলব করা হলেও তিনি হাজির হননি কিংবা চাহিদামতো নথিপত্র সরবরাহ করেননি। তাকে ডাকা হয়েছিল সেসব তথ্য-উপাত্ত যাচাই বাছাইয়ের জন্য। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই দুদকের তলবি নোটিশকে অবহেলা করে গেছেন। সর্বশেষ তাকে শেরেবাংলা নগর থানার মাধ্যমে তলবি নোটিশের চিঠি দেয়া হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ মিয়া দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করেছেন। তার বিরুদ্ধে এলজিইডি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রশাসন ও ট্রেনিং বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর আগে তিনি প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এসব সম্পদের অধিকাংশই স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও তার বিভিন্ন নিকট আত্মীয়স্বজনের নামে গড়েছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ তিনি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছেন। যাদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন।
সর্বশেষ গত ২৩ শে মে অনুসন্ধানের স্বার্থে নিজ, স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের এনআইডি কার্ড, স্মার্ট কার্ড, পাসপোর্ট, জন্মসনদের ফটোকপিসহ হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। দুদক আইন ২০০৪ এর ১৯ (৩) ধারায় রেকর্ডপত্র সরবরাহ না করলে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা থাকলেও তিনি হাজির হননি।
আব্দুর রশিদ মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির উৎসব করেছেন। তারপরও বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুর্নীতির শাস্তির পরিবর্তে হয়েছেন পুরস্কৃত।
