বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই দ্রুতগতিতে ছুটছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার মান ফেরাতে ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে নানাবিধ পরিকল্পনা। অনেক পরিকল্পনাই কুড়াচ্ছে প্রশংসা। কিন্তু হুট করে স্কুল ভর্তিতে পরীক্ষা ফিরিয়ে আনাটাকে ভালো চোখে দেখছেন না অনেকেই। ত্বরিত নেয়া এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশে কোচিং বাণিজ্য মহামারি আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র একাডেমিক কোচিং বাণিজ্য হয় বার্ষিক প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার। আবার এডুকেশন কমিউনিকেশনের জরিপ অনুযায়ী, কোচিং সেন্টারগুলোতে বছরে ৩০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। এডুকেশন রিসার্চ কাউন্সিল (ইআরসি) নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, দেশে বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার কোচিং-বাণিজ্য হয়ে থাকে। সন্তানদের শিক্ষার জন্য এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। পাঁচ বছরে কোচিং ফি বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত মাত্রায় পরীক্ষা নির্ভরতার কারণেই বাড়ছে কোচিং বাণিজ্য। দেশের ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী কোচিং নির্ভর। দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। তবে অনিবন্ধিত কোচিং রয়েছে প্রায় ২ লাখ। কোচিং সেন্টারগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নেতিবাচক কথা বললেও আইনে আছে এর ছায়া বৈধতা। সরকার ২০১২ সালে কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা জারি করে। নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। ২০১৯ সালের হাইকোর্টের আদেশেও একই কথা বলা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোচিং বাণিজ্য বন্ধে তদারকি করতে মেট্রোপলিটন ও বিভাগীয় এলাকার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে সভাপতি করে ৯ সদস্যের কমিটি থাকার কথা। জেলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এবং উপজেলার ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে আট সদস্যের কমিটি গঠনের কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে। বাস্তবে এসব কমিটির কার্যকারিতা নাই।
আবার ক্লাসে পড়া না পড়ার যুক্তি দেখিয়ে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও নতুন নয়। সম্প্রতি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও বিমান দুর্ঘটনার সময় শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে ডিটেনশনের অভিযোগ জানানো হয়। শুধু তাই নয়, এসব কোচিং সেন্টারে নেয়া হয় ইচ্ছামতো ফি। সেইসঙ্গে কোচিং সেন্টারগুলোতে শ্লীলতাহানির ঘটনাও ঘটছে প্রতিনিয়ত।
এখন স্কুল ভর্তিতে পরীক্ষা ফেরায় আরও বাড়বে কোচিংয়ের প্রাধান্য। নতুন করে ফেরানো হয়েছে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা। এই বৃত্তিকেন্দ্রিকও বিপুল কোচিং বাণিজ্য হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলার বয়সে শিশুদের বাড়বে মানসিক চাপ। শৈশব কঠিন হওয়ার পাশাপাশি জীবনের শুরুতেই ব্যর্থ হওয়ার মানসিক প্রভাব।
শিশু বয়সে অতিরিক্ত চাপের কারণে নানাবিধ শারীরিক সমস্যা হয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড-এর গবেষণায় বলা হয়, শিশু বয়স থেকে শিক্ষার্থীদের চাপ দেয়া হলে শেখার প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়তে পারে, সৃজনশীলতা কমে যেতে পারে, সামাজিক দক্ষতা গড়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, ঘুম ও শারীরিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্কুল ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিলের পরিকল্পনা পূর্বেই ছিল। কিন্তু সংসদে হঠাৎ এনসিপি’র সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বিষয়টি উত্থাপন করেন। এরই প্রেক্ষিতে নীতিমালা প্রস্তুত না করেই ঘোষণা দেয়া হয়। মন্ত্রণালয় থেকে আরও জানা যায়, স্কুল ভর্তি পরীক্ষার নীতিমালা প্রস্তুতে এখনো বেশ কয়েক মাস সময় রয়েছে। এরপূর্বে কয়েকধাপে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। কীভাবে এই পরীক্ষা পদ্ধতি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বা সৃজনশীল করা যায়। এই ভর্তি পরীক্ষার শিক্ষার্থীদের ওপর যাতে চাপ না থাকে সে ব্যবস্থা করা হবে। সেইসঙ্গে কো-কারিকুলাম একটিভিটিস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, লটারির মাধ্যমে বিগত বছরগুলোতে ভর্তি বাণিজ্য কমে এসেছিল। পরীক্ষা হলে ফের ভর্তি বাণিজ্য শুরু হবে। লটারি পদ্ধতি থাকায় দুর্নীতি কমে এসেছিল। ইউএসএ’তে শিক্ষা নিয়ে পিএইচডি করছেন আরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্কুল ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে ব্যর্থতা। কারণ শহরে পর্যাপ্ত মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে নাই। ক্যাচমেন্ট এরিয়াতে মানসম্মত স্কুল থাকলে পরীক্ষায় যেতে হয় না। তাই পরীক্ষা ফিরিয়ে না এনে কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভাবতে হবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি পদ্ধতিই তুলনামূলকভাবে ভালো। তবে লটারি যেন স্বচ্ছভাবে হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যে ধরনের পরীক্ষা নেয়া হয়, তাতে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ে, তারাই মূলত এগিয়ে থাকে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এই সরকার শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে এই বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত তড়িঘড়ি নেয়া হয়েছে। যেমন স্কুল ভর্তিতে লটারি তো কোনো ভালো বিষয় ছিল না। কিন্তু পরীক্ষা না নিয়ে ভালো কোনো বিকল্প হতো কিনা সেটা অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা যেতো। আমাদের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী। তাই এই শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গ্যাসের মূল্য বাড়ালে যদি গণশুনানি হতে পারে তাহলে শিক্ষার বিষয়গুলো নিয়ে কেন নয়?
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষা পদ্ধতি সরকার চাপিয়ে দিচ্ছে। যেমন বৃত্তি পরীক্ষা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। গবেষণার তথ্য আছে বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা কোচিং-গাইডে ঝুঁকে পড়েন। বৃত্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধা যাচাই এটাও একটা কোটা। আমরা বেছে বেছে পরীক্ষা নিচ্ছি। শিক্ষকরা বৃত্তি পরীক্ষার কারণে নিয়মিত ধারাবাহিক মূল্যায়ন থেকে সরে আসে। ইংরেজি মিডিয়ামে প্রতি ৩ মাসে একটা অগ্রগতি কার্ড পাওয়া যায়। এগুলোর দিকে আমরা না যেয়ে বৃত্তি পরীক্ষায় ফিরে গেলাম। তিনি পরীক্ষার বিষয়ে পুনর্বিবেচনায় জোর দেন।
যদিও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের চাপ বৃদ্ধি কিংবা কোচিংয়ের বিপক্ষেই কথা বলছেন। তিনি বলেন, ভর্তি পরীক্ষা যাতে কঠোর না হয় সেদিকে আমরা খেয়াল রাখবো। আমরা চাই না, শিশুদের ওপর মানসিক চাপ বৃৃদ্ধি পাক। এখনো পরীক্ষার নীতিমালা প্রস্তুত হয়নি। আমরা আশা করছি, সহনশীল একটা পরীক্ষা পদ্ধতি হবে।
এ ছাড়াও তিনি কোচিংয়ের বিষয়ে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। সোমবার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীদের কোনো কোচিং সেন্টারে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের ‘ইন হাউজ’ কোচিং করাতে বলেছেন তিনি। এরপরও ছাত্রীরা বাইরে কোচিং করলে শিক্ষকরা দায়ী থাকবেন এবং শাস্তির মুখে পড়বেন বলেও হুঁশিয়ার করেছেন মন্ত্রী। এদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমকে ডেকে নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী এমন নির্দেশনা দেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এমন নির্দেশনা দেয়ার পথে হাঁটছে সরকার।

Md. Sizul Islam
২ মাস আগেকোচিং এবং গাইড ব্যবসায়ীদের ফাঁদে পড়ে সরকারের এই সিদ্ধান্ত মোটেও ভাল কিছু বয়ে আনবেনা। শিক্ষার্থীদের উপর বইয়ের বোঝা আর অভিভাবকদের উপর খরচের বোঝা বাড়বে ছাড়া কমবেনা। তাই এই আত্নঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে।