ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল: আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ

স্বপ্নের ইউরোপ, নাকি মৃত্যুর টিকিট

ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল: আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ

ফন্ট সাইজ:

ভূমধ্যসাগরে আবারও মৃত্যুর মিছিল। আবারও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের নাম। কিন্তু এ নাম কোনো সাফল্যের নয়, কোনো গৌরবের নয়, কোনো অর্জনের নয়—এ নাম এসেছে মৃত্যুর তালিকায়, নিখোঁজের খাতায়, মানবপাচারের রুটে। একের পর এক তরুণ ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরছে, আর আমরা এখনো “বিদেশ যাওয়া”কে স্বপ্ন বলে চালিয়ে দিচ্ছি! প্রশ্ন হচ্ছে—এটা কি স্বপ্ন, নাকি সরাসরি মৃত্যুর টিকিট?

সত্যটা নিষ্ঠুর। বাংলাদেশের বহু তরুণ আজ ইউরোপে যেতে চায় না—তারা আসলে দেশ থেকে পালাতে চায়। বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা, সামাজিক প্রতিযোগিতা, অকারণ উচ্চাভিলাষ আর ভাঙা আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে এমন এক মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যেখানে “দেশে থাকা”কে ব্যর্থতা আর “বিদেশে যাওয়া”কে বিজয় মনে করা হয়। আর এই অসুস্থ মানসিকতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে মৃত্যুর ব্যবসা।

লিবিয়া থেকে গ্রিস—এই রুট কোনো যাত্রাপথ নয়, এটি কবরের করিডর। গাদাগাদি নৌকা, না খাবার, না পানি, না নিরাপত্তা, না বাঁচার নিশ্চয়তা। আছে শুধু একটাই বিষাক্ত প্রতারণা—“ইউরোপে ঢুকতে পারলেই জীবন বদলে যাবে।” এই মিথ্যাই সবচেয়ে বেশি বিক্রি করে দালালরা। আর সবচেয়ে ভয়ংকর হলো—এই মিথ্যা এখন শুধু দালালরা বলে না, সমাজও বলে, আত্মীয়ও বলে, পাড়া-প্রতিবেশীও বলে, ফেসবুকও বলে।

এই সমাজে আজ একজন তরুণ কীভাবে টাকা কামায়, সেটা বড় কথা নয়; সে কোন দেশে থাকে, সেটাই বড় কথা। ছেলে সৎ পথে কষ্ট করে দেশেই কিছু করছে—এতে সম্মান কম। কিন্তু সে যদি ইতালি, গ্রিস, ফ্রান্স, জার্মানির নাম জুড়ে দিতে পারে—তাহলেই যেন সে “সফল”। এই সামাজিক বিকৃতি না ভাঙলে, সাগরে লাশ ভাসা থামবে না। কারণ সত্যি কথা হলো—মানুষ শুধু পেটের দায়ে মরতে যায় না, অনেক সময় সে মরতে যায় সামাজিক মর্যাদার মিথ্যা লোভে।

আমরা এখনও এদের “দালাল” বলি। ভুল বলি। এরা দালাল নয়, এরা পেশাদার খুনি। কারণ এরা জানে কোন নৌকা ডুববে, কোন পথে মানুষ মরবে, কোথায় না খেয়ে, না পানিতে, শ্বাসরোধে, বা ঢেউয়ে প্রাণ যাবে। সব জেনেও তারা টাকা নেয়, পরিবারকে স্বপ্ন দেখায়, ছেলেদের গাদাগাদি করে নৌকায় তোলে। এর নাম শুধু প্রতারণা নয়—এটি পরিকল্পিত হত্যার ব্যবসা।

আরও ভয়ংকর সত্য হচ্ছে—এই খুনিরা সমাজে লুকিয়ে নেই, তারা সমাজের মাঝখানেই আছে। তারা চা-স্টলে বসে, ধর্মীয় উপাসনালয়ে যায়, এলাকায় “ভাই” নামে পরিচিত, অনেক সময় সম্মানিতও। একজন ছিনতাইকারীকে আমরা অপরাধী বলি, কিন্তু একজন মানবপাচারকারীকে অনেক সময় “লোক সেট করে” এমন ক্ষমতাবান মানুষ ভাবি। এ এক জাতীয় নৈতিক পচন। যে লোক মানুষকে সাগরে মরতে পাঠায়, সে সমাজে মাথা উঁচু করে হাঁটে—এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে?

রাষ্ট্রের কথায় আসা যাক। প্রতিবার একই চিত্র—শোক, বিবৃতি, নিন্দা, কনস্যুলার তৎপরতা, পরিচয় শনাক্ত, মরদেহ ফেরত আনার প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মূল অপরাধচক্র কোথায়? তারা কি ধরা পড়ে? তাদের কি বিচার হয়? তাদের সম্পদ কি জব্দ হয়? তাদের রাজনৈতিক বা সামাজিক ছাতা কি সরানো হয়? না। বরং কিছুদিন পর সব আগের মতো। আবার দালাল সক্রিয়, আবার নতুন তরুণ নিখোঁজ, আবার নতুন পরিবার সর্বস্বান্ত।

এই ব্যর্থতা কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়, এটি রাষ্ট্রিক দুর্বলতার প্রকাশ। মানবপাচার বন্ধ করতে হলে শুধু বক্তৃতা নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার দাঁত দেখাতে হবে। গ্রাম-পর্যায়ের সোর্স-দালাল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রুটের মাস্টারমাইন্ড পর্যন্ত—সবাইকে ধরতে হবে। লিবিয়া, গ্রিস, ইতালি, তিউনিসিয়া, মিশর—এই পুরো নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আন্তঃদেশীয় গোয়েন্দা অভিযান লাগবে। আর সবচেয়ে জরুরি—একটা-দুটো নয়, চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বিচার। এমন বিচার, যাতে গ্রামের চায়ের দোকানেও মানুষ বলে—“এই লাইনে গেলে শেষ।”

কিন্তু দালালচক্রের বিরুদ্ধে লড়াই যথেষ্ট নয়, যদি তরুণদের হতাশার বিরুদ্ধে লড়াই না করা যায়। এ দেশে অসংখ্য তরুণ আজ বিশ্বাস করে—যোগ্যতা দিয়ে কিছু হবে না, পরিশ্রমে কিছু হবে না, দেশে থেকে ভবিষ্যৎ নেই। এই বোধটা ভয়ংকর। কারণ যখন রাষ্ট্র সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়, সমাজ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, আর অর্থনীতি আশা দিতে ব্যর্থ হয়—তখন মৃত্যু পর্যন্ত অনেকের কাছে “রিস্ক” নয়, “অপশন” হয়ে যায়। এটাই জাতীয় বিপদ।

তাই তরুণদের শুধু “যেও না” বললে হবে না। বাস্তব বিকল্প দিতে হবে। দক্ষতাভিত্তিক কাজ, সাশ্রয়ী প্রশিক্ষণ, বৈধ অভিবাসনের নিরাপদ পথ, দেশে টেকসই আয়ের সুযোগ—এসব ছাড়া সচেতনতা ক্যাম্পেইন কাগজেই ভালো দেখাবে, বাস্তবে নয়। যে ছেলে মনে করে দেশে তার কিছুই হবে না, সে পোস্টার দেখে থামে না—সে নৌকায় উঠে পড়ে।

মিডিয়ারও দায় কম নয়। আমরা কি অনিচ্ছায় “বিদেশ মানেই সাফল্য” গল্পটা বারবার শক্তিশালী করিনি? “ইউরোপে সেটেল”, “বিদেশফেরত”, “অনেক টাকা করেছে”—এই গল্পগুলো আমরা খুব সহজে ছড়াই। কিন্তু কতবার দেখাই—অবৈধ পথে গিয়ে কতজন ডিটেনশন ক্যাম্পে পচে, কতজন কাগজহীন হয়ে বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়ায়, কতজন অমানবিক শ্রমে শোষিত হয়, কতজন মানসিকভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, আর কতজন সাগরে হারিয়ে যায়? শুধু স্বপ্ন বিক্রি করলে চলবে না, স্বপ্নের কবরও দেখাতে হবে।

ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ও মাইগ্রেন্ট ইনফোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগর হয়ে ৩ হাজার ৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এ দুই মাসে ভূমধ্যসাগরে প্রায় ৬৬০ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে।

সবশেষে একটি নির্মম সত্য: জীবন কোনো জুয়া নয়। বিদেশে যাওয়া দোষ নয়, বৈধ পথে মর্যাদার সঙ্গে অভিবাসন অপরাধ নয়। কিন্তু মৃত্যুকে জেনেও, প্রতারণাকে জেনেও, অবৈধ নৌপথে জীবন বাজি রাখা কোনো বীরত্ব নয়—এটি আত্মঘাতী বিভ্রম। পরিবারগুলোকেও বুঝতে হবে—ছেলেকে ইউরোপে পাঠানোই সফলতা নয়; ছেলেকে জীবিত রাখা, নিরাপদ রাখা, সৎ উপার্জনে রাখা—এটাই সফলতা।

আর কত লাশ ভাসলে আমরা জাগবো? ভূমধ্যসাগর আজ শুধু সাগর নয়—এটি বাংলাদেশের অস্থির উচ্চাভিলাষের কবরস্থান, রাষ্ট্রিক দুর্বলতার আয়না, সামাজিক অসুস্থতার জলজ দলিল। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশ আসুক—আমরা চাই। কিন্তু লাশের সারি ধরে নয়। মানবপাচারের রুট ধরে নয়। মৃত্যুসংবাদ হয়ে নয়।

বাংলাদেশ আসুক তার তরুণদের দক্ষতা দিয়ে, বৈধ শ্রমবাজার দিয়ে, শক্তিশালী অর্থনীতি দিয়ে, মর্যাদাপূর্ণ কূটনীতি দিয়ে। কিন্তু তার আগে দরকার তিনটি জিনিস—রাষ্ট্রের নির্মম কঠোরতা, সমাজের নির্দয় আত্মসমালোচনা, আর তরুণদের বাস্তব জাগরণ।

যে তরুণ এখনো ভাবছে “একবার ইউরোপে ঢুকতে পারলেই জীবন বদলে যাবে”—তার জন্য ভূমধ্যসাগরের ঢেউ-ই আজ সবচেয়ে বড় উত্তর: সব স্বপ্ন গন্তব্যে পৌঁছায় না। কিছু স্বপ্ন মাঝপথেই ডুবে যায়। কিছু স্বপ্ন লাশ হয়ে ভেসে ওঠে। এখনও সময় আছে। মৃত্যুর দালালদের না বলুন। অবৈধ রুটকে না বলুন। মিথ্যা ইউরোপ-স্বপ্নকে না বলুন।

কারণ জীবন কোনো ভিসাবিহীন নৌকা নয়, যাকে ইচ্ছেমতো মৃত্যুর সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া যায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email:  [email protected]

no need

২ মাস আগে

Bangladesh-e Onek Manusher onek "Loov".

no need

২ মাস আগে

Onek Besi Shahoos thakah ''Uchit'' naa. Bangladesh-e Onek Manush ''Onek Ochacheaton''.

Citizen

২ মাস আগে

বেআইনিভাবে বিদেশ যাওয়ার নাম করে আমাদের দেশের যুবকরা প্রতিনিয়ত অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। মিডিয়া মালিকদের প্রতি অনুরোধ—শুধু বিনোদন নয়, দালালের হাত থেকে বাঁচতে মানুষকে সতর্ক করার দায়িত্বও আপনাদের। যারা প্রাণ হারিয়েছেন বা নিঃস্ব হয়েছেন, তাদের খবরগুলো বেশি বেশি প্রচার করুন যাতে আর কেউ এই মরণফাঁদে পা না দেয়।

মন্তব্য করুন