আতঙ্ক নয়-শিশু সুরক্ষায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তেই সমাধান

আতঙ্ক নয়-শিশু সুরক্ষায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্তেই সমাধান

ফন্ট সাইজ:

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চারটি বিভাগ, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বরিশালে ৬৬৭ শিশু হামে আক্রান্তের খবর স্বাভাবিকভাবেই দেশব্যাপী উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের আক্রান্ত করে এবং বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ওঠা। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি এবং এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকা পায়নি বা অপুষ্টিতে ভুগছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে শিশু মৃত্যুগুলো রিপোর্ট হয়েছে, সেগুলোর একটি অংশ হামজনিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে; তবে এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুই পরীক্ষাগারে বা ক্লিনিক্যালভাবে নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে প্রমাণিত হয়নি।
তবে এই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি গভীর সমস্যার প্রতিফলন যা একদিনে তৈরি হয়নি। যখন কোনো শিশু ইতিমধ্যে হাম রোগে আক্রান্ত হয়, তখন ভ্যাকসিন আর প্রতিরোধমূলক ভূমিকা রাখতে পারে না। তাই জরুরি হয়ে ওঠে সঠিক চিকিৎসা ও সহায়তামূলক ব্যবস্থা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পুষ্টি ও তরল গ্রহণ নিশ্চিত করা, জ্বর নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শিশুকে পরিষ্কার ও আরামদায়ক পরিবেশে রাখা। ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্টেশন অত্যন্ত কার্যকর, কারণ এটি হামজনিত জটিলতা, বিশেষ করে চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি, নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে (শুধু সেকেন্ডারি ইনফেকশনের ক্ষেত্রে)। আক্রান্ত শিশুকে অন্যদের থেকে আলাদা রাখা সংক্রমণ বিস্তার রোধে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ভ্যাকসিনের অভাব থাকলেও সঠিক পরিচর্যা, পুষ্টি, ভিটামিন-এ এবং সময়মতো চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করলে হামজনিত মৃত্যু অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গত কয়েক বছরের টিকাদান কভারেজের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত এটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। প্রায় ৮৬% থেকে ১০৩% এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে (যেখানে ২০২১ ও ২০২২ সালে কিছু অ্যান্টিজেনে ১০০% এরও বেশি রিপোর্টেড কভারেজ দেখা গেছে)। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে এই কভারেজ হঠাৎ করেই নেমে প্রায় ৫৯.৬%-এ, যা একটি গুরুতর সতর্ক সংকেত।
এই পতনের অর্থ হচ্ছে, বিপুল সংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে বা পর্যাপ্ত সুরক্ষা পায়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে সর্বশেষ এম আর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ সালের শেষ এবং ২০২১ সালের শুরুতে। জনস্বাস্থ্য নীতিমালায় নিয়মিত ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ঘাটতি পূরণ করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ রুটিন ইমিউনাইজেশন সব শিশুকে কভার করতে পারে না। যখন কয়েক বছর ধরে কোনো ক্যাম্পেইন হয় না, তখন প্রতি বছর জমতে থাকা টিকাবিহীন বা আংশিক সুরক্ষিত শিশুদের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সেই জমে থাকা ঝুঁকিই এখন বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে যা হামসহ অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এই বাস্তবতাকে আরও জটিল করেছে মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য সহকারীদের দীর্ঘ আন্দোলন ও কর্মবিরতি, ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইনের অনিয়মিততা এসব মিলিয়ে শিশুর স্বাস্থ্যসুরক্ষা দুর্বল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারের অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতা, যার ফলে মাঠপর্যায়ে সেবা ব্যবস্থাপনা আরও ভেঙে পড়ে। নীতিগত পরিবর্তনগুলো যথাযথ প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা ছাড়া গ্রহণ করায় সিস্টেমে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলো বিঘ্নিত হয়। বিশেষ করে ভিটামিন-এ এর ঘাটতি হাম রোগের জটিলতা বাড়াতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
নীতিগত দিক থেকেও কিছু গুরুতর সিদ্ধান্তের প্রভাব এখন সামনে আসছে। পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে অপারেশনাল প্ল্যান ও লাইন ডিরেক্টর কাঠামো বাতিল করে হঠাৎ করে উচ্চ-ভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। এর ফলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়। একইসঙ্গে, ভ্যাকসিন ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ ৮৫০ কোটি টাকার অর্ধেক সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরের মাধ্যমে টেন্ডার করে কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও, এই প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক ভ্যাকসিন ক্রয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় পুরো প্রক্রিয়াই স্থবির হয়ে পড়ে। এর ফল দেশ জুড়ে ভ্যাকসিন ঘাটতি। এখন যে শিশু মৃত্যুগুলো আমরা দেখছি, তা মূলত দীর্ঘদিনের নীতি-ঘাটতি, পরিকল্পনার দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নগত অদক্ষতার সম্মিলিত ফল। বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি: নিয়মিত ইমিউনাইজেশন ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকা, টিকাদান কর্মসূচির কৌশলগত পরিকল্পনার অভাব, ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয়হীনতা এবং মাঠপর্যায়ে জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হঠাৎ ও অপ্রস্তুত নীতিগত পরিবর্তন, যেমন পূর্বের কার্যকর অপারেশনাল কাঠামো বাতিল করে যথাযথ সক্ষমতা ছাড়াই নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর যার ফলে অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ভ্যাকসিন ক্রয়ে দ্বৈত পদ্ধতি গ্রহণ করেও কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়নি, ফলে সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা ও স্টক-আউট তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং ধারাবাহিক নীতিগত অদক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, এবং বাস্তবায়নে অক্ষমতার একটি সঞ্চিত প্রতিফলন, যা এখন দৃশ্যমান আকারে সামনে এসেছে।
তবে এখানেই আশার জায়গা রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে দ্রুত এম আর ক্যাম্পেইন শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ। একইসঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার অতীতের সৃষ্ট জটিলতা ও নীতিগত বাধাগুলো দূর করার ব্যাপারে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। বিশেষ করে ভ্যাকসিন সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে উঠতে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া দ্রুততর করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন ঘাটতি পূরণ করা যায়। পাশাপাশি ভ্যাকসিন সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠন, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের পুনরায় সক্রিয় ও উদ্বুদ্ধ করা এবং ভিটামিন-এ কর্মসূচি জোরদার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, যাতে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমাদের আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের দিকে যেতে হবে। প্রতিটি মৃত্যু তথ্য পর্যালোচনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান। কিন্তু ভুল ব্যাখ্যা বা অযাচিত আতঙ্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম এবং বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন দক্ষতার মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে। অতীতের জটিলতা দূর করে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে সরকারের সক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতি সুস্পষ্ট।
লেখক: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন