দেশে আর্থিক অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই যেন এক পরিচিত বয়ান সামনে চলে আসে—সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত বিপুল অর্থের গল্প। বিশেষ করে আমলা, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতাদের ঘিরে আলোচনায় এই ‘সুইস ব্যাংক’-এর ট্যাগটি প্রায় অবধারিতভাবে জুড়ে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপাচার, বিদেশে সঞ্চিত সম্পদ এবং তা পুনরুদ্ধারের প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলি–এর সুইস রাষ্ট্রদূতের বৈঠকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ এবং অবৈধ সম্পদ ফেরত আনার বিষয়ে সহযোগিতার যে বার্তা এসেছে, তা আশাব্যঞ্জক বলেই মনে হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো এ ধরনের কূটনৈতিক অঙ্গীকার নতুন নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, সদিচ্ছা থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। কারণ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ একটি জটিল, বহুমাত্রিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ প্রক্রিয়া। এটি কার্যকরভাবে মোকাবেলা করতে হলে কেবল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নয়, বরং শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নির্ভরযোগ্য তদন্ত এবং সুসংহত আইনি প্রক্রিয়া অপরিহার্য। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই, যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও বেশি সতর্ক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ, এই দেশগুলোতে পাচার হওয়া অর্থের প্রবাহ থাকার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দূতাবাসগুলো যদি সক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং সমন্বয়ের কাজ না করে, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কখনোই বাস্তব ফল দেবে না।
বাংলাদেশে অর্থপাচার দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনীতি, সুশাসন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত। তবে সময়ের সঙ্গে এর ধরন ও কৌশল উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অতীতে যেখানে ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন বা হুন্ডি ছিল প্রধান মাধ্যম, বর্তমানে সেখানে যুক্ত হয়েছে ডিজিটাল প্রতারণা, অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি, অফশোর কোম্পানি এবং ক্রিপ্টো সম্পদের মতো নতুন উপাদান। ফলে এই অপরাধ এখন একটি আন্তঃদেশীয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর চরিত্র ধারণ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কার্যকর হতে হলে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা শক্তিশালী হতে হবে। বিদেশি রাষ্ট্র বা বিচারব্যবস্থা কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদ ফেরত দেয় না; তারা প্রমাণ চায় সুনির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য, তদন্তের ধারাবাহিকতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। বাংলাদেশ বহু ক্ষেত্রে এখানেই দুর্বলতার মুখে পড়ে।
এই দুর্বলতার একটি প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করলেও একটি সমন্বিত কৌশলগত কাঠামো স্পষ্ট নয়। ফলে তথ্য বিনিময় ধীর হয়, তদন্ত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং মামলাগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে টেকসই হতে পারে না।
তবে এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায় বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর ভূমিকা। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দূতাবাস কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্বের কেন্দ্র নয়; এটি তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ স্থাপন এবং কৌশলগত সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশি অর্থের প্রবাহ বেশি বা অর্থপাচারের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানে অবস্থিত দূতাবাসগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দূতাবাসগুলো স্বাগতিক দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে সন্দেহজনক আর্থিক প্রবণতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তারা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারে এবং তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়েও সহায়তা করতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে দূতাবাসগুলোর ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। তাদের জন্য মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে সুস্পষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সূচক থাকতে হবে তথ্য সংগ্রহের মান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় অবদান এবং তদন্তে সহায়ক ভূমিকা। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই দায়িত্ব কার্যকর হবে না।
তবে দূতাবাসকে সক্রিয় করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামো শক্তিশালী করাও অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তখনই সফল হয়, যখন আবেদনকারী রাষ্ট্র নিজেই বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রস্তুত থাকে। কিন্তু যদি তদন্ত দুর্বল হয়, আইনি প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয় বা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকে, তাহলে বিদেশি অংশীদারদের আস্থা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
এখানে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মানি লন্ডারিংবিরোধী কার্যক্রম তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সকলের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। যদি জনমনে পক্ষপাতিত্বের ধারণা তৈরি হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবেলায় প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানোও জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ অনিচ্ছাকৃতভাবে এসব অপরাধের অংশ না হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মানি লন্ডারিং মোকাবেলা একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। কূটনৈতিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর সমন্বয়, নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ এবং দূতাবাসসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই অবৈধ অর্থপ্রবাহ রোধ করতে এবং পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার করতে চায়, তাহলে তাকে কথার বাইরে গিয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর সমস্যার গভীরতা অক্ষুণ্ণই থাকবে।
লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ইমেইল: [email protected]
কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই মূল: মানি লন্ডারিং মোকাবেলায় দূতাবাসের জবাবদিহি জরুরি
সহিদুল আলম স্বপন
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
৩০ মার্চ (সোমবার), ২০২৬, ৯ঃ১৭ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
