লিবিয়া থেকে নৌকায় করে অবৈধভাবে গ্রীসে যাওয়ার পথে পথ হারিয়ে দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে সুনামগঞ্জের ১০ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৪ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। এমন করুণ মৃত্যুতে পরিবার-পরিজন ও এলাকায় শোকের মাতম চলছে। সহায়সম্বল বিক্রি করে দালালদের সর্বস্ব দিয়েও তাদের ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না। শনিবার সন্ধ্যার পর এই ঘটনাটি প্রকাশ পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম জানা যায়।
সূত্রমতে, সাগরে ভেসে মারা যাওয়া মোট ২২ জন যুবকের মধ্যে ১০ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই, জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলায়। মরদেহ দুইদিন বোটে রেখে একপর্যায়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে দালালদের নির্দেশে সেগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেয়া হয়। জীবিতদের উদ্ধার করে গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে এবং গুরুতর আহত দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত নিহত ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন- দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫), রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮) ও দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম এবং জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী।
এ ছাড়া দিরাই উপজেলার মাটিয়াপুর গ্রামের তারেক মিয়া নামে এক যুবক পাঁচদিন ধরে লিবিয়া থেকে গ্রীসে যাওয়ার পথে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। গ্রীস থেকে বেঁচে ফেরা দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের রুহান মিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও বার্তায় জানান, লিবিয়া থেকে সাগরপথে ছোট একটি বোটে মোট ৪৩ জন একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেন। তাদের বড় নৌকার কথা বলে একটি ছোট হাওয়াই বোটে তুলে দেয়া হয়। ওই বোটে ৫ জন সুদানের নাগরিক ও ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকার কারণে খাবার ও পানির সংকটে একে একে ২২ জন বোটেই মারা যান।
দিরাই উপজেলার মো. সাহান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া জানান, দালাল জসিমের সঙ্গে প্রত্যেকের ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে গত মাসে বাড়ি থেকে রওনা হন তারা। জসিমের বাড়ি ছাতক অথবা দোয়ারাবাজার হবে। সে থাকে লিবিয়ায়। তাকে প্রথমে ৬ লাখ টাকা করে দেয়া হয়েছে, বাকি ৬ লাখ টাকা তারা গ্রীসে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। প্রথমে তাদের ঢাকা থেকে বিমানে সৌদি আরব, পরে সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নেয়া হয়। কয়েকদিন ধরে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। শনিবার বিকালে আত্মীয় রুহান মিয়ার মাধ্যমে তারা মৃত্যুর খবরটি জানতে পারেন। এদিকে শুক্রবার ভোরে গ্রীসের কোস্ট গার্ড গণমাধ্যমে জানায়, ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী ও এক শিশুসহ ২৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করেছে। পরে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে গ্রীসের কোস্ট গার্ড জানায়, এই ঘটনায় ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানের নাগরিক এবং ১ জন চাদের নাগরিক জীবিত উদ্ধার হয়েছেন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এ জেলার তিন উপজেলার ১০ জন রয়েছেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানান, বিভিন্ন মাধ্যমে সাগরে ভেসে এ জেলার কয়েকজনের মৃত্যুর সংবাদ জেনেছি। তিনি বলেন, লিবিয়া দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
