২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০.৬০ শতাংশ। ঋণের এই বিশাল পাহাড় দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ঋণখেলাপি সংসদ সদস্যদের আইনি কৌশল ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অনুপ্রবেশ।
আইনি ফাঁকফোকর ও কৌশলী অংশগ্রহণ: গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ থাকলেও প্রার্থীরা এক চতুর কৌশল অবলম্বন করছেন। তারা উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ (Stay Order) নিয়ে সাময়িকভাবে নিজেদের নাম সিআইবি বা খেলাপি তালিকা থেকে সরিয়ে রাখছেন। ফলে আইনিভাবে তারা নির্বাচনের যোগ্য হয়ে উঠছেন, যদিও বাস্তবে বিশাল অঙ্কের ঋণ অপরিশোধিতই থেকে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩১ জন প্রার্থী আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ৩০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম হন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে ঋণখেলাপি হওয়া এখন আর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পথে বড় বাধা নয়। আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও কৌশলগত স্থগিতাদেশের মাধ্যমে বড় বড় ঋণখেলাপিরা অনায়াসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সভায় ঢুকে পড়ছেন, যা আর্থিক খাতের সুশাসনের জন্য এক অশনিসংকেত।
সংসদে ঋণখেলাপিদের অবস্থান: বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ সংসদের ওই ৩০ জনের মাঝে ৯ জন সরাসরি সংসদ সদস্য (গচ) হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংসদ অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। অনেকে নির্বাচনের ঠিক আগে নামমাত্র কিছু টাকা জমা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল (Reschedule) করেছেন, যা মূলত একটি সাময়িক আইনি রক্ষাকবচ মাত্র।
ঝুলে থাকা প্রজ্ঞাপন ও আইনি জটিলতা: একটি বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত বিএনপি’র দুই প্রার্থীর বিষয়ে এখনো গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। তারা হলেন:
১. সারোয়ার আলমগীর (চট্টগ্রাম-২): ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোটে নির্বাচিত।
২. আসলাম চৌধুরী (চট্টগ্রাম-৪): ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৭৪ ভোটে নির্বাচিত।
এর প্রধান কারণ হলো তাদের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা। তারা সংসদে যোগ দিতে পারছেন না, সরকারের কাজে বা সংসদীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। আদালত বা নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে পারছেন না।
নির্বাচিত হলেও শপথে স্থগিত: প্রজাতন্ত্রের উচ্চমাত্রার দায়: রাষ্ট্র একটি প্রজাতান্ত্রিক সত্তা হিসেবে তার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নির্বাচিত প্রতিনিধি শপথ না নিলে গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব রুদ্ধ থাকে, যা প্রজাতন্ত্রের মৌলিক কার্যক্রম ও নৈতিক দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে, দুই সংসদ সদস্যের গেজেট প্রকাশ না হওয়া কেবল একটি আইনি স্থগিতাদেশ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রজাতান্ত্রিক অঙ্গনের ওপর একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।
বিলম্বিত বিচার ও সার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতি: দায় কার?: এখানে একটি গভীর সাংবিধানিক ও নৈতিক প্রশ্ন দেখা দেয়। যদি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আদালত চূড়ান্তভাবে এই দুই সংসদ সদস্যকে শূন্য বা অযোগ্য ঘোষণা করে, তবে স্বাভাবিকভাবেই ওই আসনগুলোতে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। কিন্তু এই যে দীর্ঘ সময় ধরে আসন দু’টিকে ‘ঝুলিয়ে’ রাখা হলো, তার ফলে ওই এলাকার লাখ লাখ মানুষের যে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলো-এই দীর্ঘকালীন ‘সার্বভৌমত্বহীনতার’ দায় কে নেবে?
একটি নির্দিষ্ট জনপদ মাসের পর মাস জাতীয় সংসদে নিজেদের কণ্ঠস্বরহীন থাকছে। জনগণের সার্বভৌমত্ব, যা কিনা তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার কথা, তা এখন আদালতের স্থগিতাদেশের ফাইলে বন্দি। এই বিলম্ব কেবল প্রশাসনিক স্থবিরতা নয়; এটি জনগণের ভোটাধিকারকে এক প্রকার ‘স্থগিত’ (ঝঁংঢ়বহফবফ) করে রাখা। যদি তারা অযোগ্যই হন, তবে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করে পুনরায় নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল। আর যদি তারা যোগ্য হন, তবে তাদের শপথ গ্রহণে বাধা থাকা উচিত নয়।
এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র কেবল আইনগত কাঠামো নয়; এটি গণতান্ত্রিক নৈতিক দায়বদ্ধতার অভ্যন্তরীণ প্রকাশ। নির্বাচিত প্রতিনিধির শপথ গ্রহণে বিলম্ব কেবল তাদের ব্যক্তিগত অধিকারকে নয়, জনগণের প্রজাতান্ত্রিক অধিকার ও প্রজাতন্ত্রের নৈতিক সার্বভৌমত্বকেও স্থগিত রাখে। এই স্থগিতাদেশ রাষ্ট্র এবং আদালতের জন্য এক অনিবার্য পরীক্ষা, যেখানে দ্রুত ও সুষম পদক্ষেপ গ্রহণই গণতান্ত্রিক ন্যায়বিচার এবং প্রজাতন্ত্রের আত্মপরিচয় রক্ষার একমাত্র উপায়।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

Md Musleha Uddin
২ মাস আগেএদেরকে সংসদে যোগদানের সুযোগ দেয়া উচিত কারণ ওনারা ব্যাবসায়ী ওনাদের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ চাকরি করে তাদের জিবন জিবিকা নির্বাহ করছে। ব্যাংকের অতিরিক্ত সুদের হারের কারণে অনেক ব্যাবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে জরুরি ভিত্তিতে ব্যাংক সুদ কমানোর অনুরোধ করছি