হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ

হাম সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ

ফন্ট সাইজ:

দেশে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হাম সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। কয়েকটি জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চলতি মাসেই হামে ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দীর্ঘ ৮ বছর হামের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে টিকা সংগ্রহে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। শিশুদের হামের টিকা দেয়ায় ঘাটতি আছে। হাম খুবই সংক্রামক, অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫-১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান মানবজমিনকে বলেন, সারা দেশেই কমবেশি হাম আছে। তবে আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখতে পাচ্ছি। তবে সরকারের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোয় যোগাযোগ করে জানা গেছে, ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩টি, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৩টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেয়া হয়। সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ সালে। তখন ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে এই টিকা দেয়ার কথা ছিল। তার আগে ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০১৪ সালে।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, হাম সাধারণত শিশুদেরই হয়। প্রথমে জ্বর হয়। জ্বর তীব্র হতে থাকে। এরপর প্রথমে মুখমণ্ডলে র‍্যাশ উঠতে থাকে। তারপর তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের এ সময় নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালকে হাম রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। রাজধানীতে শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালসহ বড় বড় হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

গত ৮ বছর দেশে হামের টিকাই দেয়া হয়নি: দেশে দীর্ঘ ৮ বছর হামের টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার কথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নতুন করে টিকা সংগ্রহে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল ওষুধ শিল্প মেলার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এই তথ্য জানান। তিনি বলেন, মিজেলসের রোগী অনেক বেড়েছে। আট বছর আগে শেষবার ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো সরকার এই টিকা দেয়নি। তিনি জানান, ইতিমধ্যে টিকা ক্রয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, পারচেজ কমিটি পাস হয়েছে। খুব দ্রুত আমরা ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে টিকাদান কার্যক্রম শুরু করবো।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনা হয়। তবে দীর্ঘদিন এই কার্যক্রম স্থবির থাকায় নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চলতি বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ৪ঠা জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের রোগী শনাক্ত হয় এবং ১০ই জানুয়ারি সতর্কতা জারি করা হয়। পরে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতির কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ঢাকার ডিএনসিসি’র ওয়ার্ডগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে। আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সংযুক্ত ব্যবস্থা রাখা হয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেলে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকাতেও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সংকটে শিশুমৃত্যুর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নতুন ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করছে বলেও জানান তিনি। ইতিমধ্যে পাঁচটি ভেন্টিলেটর পাওয়া গেছে, যার চারটি রাজশাহীতে পাঠানো হবে। মন্ত্রী আরও জানান, দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শিগগিরই আরও ১২টির বেশি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করবে। এসব সরঞ্জাম হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী। তিনি বলেন, ১১ দিনে ৩৩ জন বেবি (শিশু) মারা গেছে আমার। রাজশাহীতে সেই ডাইরেক্টর (পরিচালক) আমাদের বলে নাই যে তার ভেন্টিলেটর নেই, নিউনেটাল ভেন্টিলেটর নেই, ওকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো উচিত।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন