মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বাংলাদেশের মাটি বহু সংগ্রামের সাক্ষী, অসংখ্য ত্যাগের গল্পের ধারক এবং রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও বর্তমান সরকারের গৌরবের বাহক। এই মাটিতে জন্মেছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, লড়াই, আশা এবং ভরসা। কিন্তু এই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে কিছু দীর্ঘ, বেদনাবিধুর এবং অন্ধকার অধ্যায়, যাদের কথা আমরা সব সময় বলি না, অনেক সময় বলতেও চাই না। অথচ এই অধ্যায়গুলোর প্রতিটি পৃষ্ঠা এখনও অশ্রুসিক্ত, প্রতিটি শব্দে গেঁথে আছে মানুষের অমোচনীয় বেদনা, অসহায়তা এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষা।
এই চিঠি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়। এটি একটি আর্তনাদ। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এই কথাগুলো তাদের পক্ষেও বলা, যাদের কণ্ঠস্বর বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতার ভার, আইনের জটিলতা আর সমাজের উদাসীনতায় চাপা পড়ে আছে। এটি তাদের জন্য লেখা, যারা আজও ন্যায়বিচারের জন্য দিন গুনছেন, নিজেদের বেদনা নিঃশব্দে বহন করছেন। এটি তাদের গল্প, যাদের জীবনে হঠাৎ নেমে এসেছিল এক অপ্রত্যাশিত ঝড়, এক মামলা, এক গ্রেফতার, এক অভিযোগ—যা সত্য ছিল না, কিন্তু যার প্রভাব ছিল নির্মম, গভীর এবং অব্যর্থ।
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার নামে যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার, সম্মান এবং নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রথম দিকে, জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার এবং আদালতে হয়রানির শিকার ছিলেন। এটি যেন এক স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দমন-পীড়নের বিস্তার পৌঁছে গেছে গ্রামের মাটিতে, সাধারণ মানুষের ঘরে, পরিবারে, প্রতিটি ঘরের প্রতিটি কোণে।
২০১৮ সালের আগে হয়তো অনেকেই ভাবতেন, এই সংকট শুধুমাত্র বড় নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। থানায় থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে দায়ের হতে থাকে অসংখ্য মামলা। অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকেই ঘটনাস্থলে ছিলেন না, কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। তবুও কাগজে-কলমে তারা অপরাধী হয়ে গেলেন।
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানার ৩নং ফুলবাড়ি ইউনিয়নের একজন নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ঘটনা এই বাস্তবতার এক বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত, এলাকার মানুষের আস্থা অর্জনকারী এই নেতা হঠাৎ করে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগ মুহুর্তে একাধিক মামলার আসামি হয়ে গেলেন। উদ্দেশ্য ছিল, যাতে তিনি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীর কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে না পারেন। অভিযোগগুলো ছিল অস্পষ্ট এবং ভিত্তিহীন। বলা হয়, তিনি বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের সময় বিভিন্ন স্থানে ছাত্রছাত্রীদের গাড়ি পোড়ানোর কাজে সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু স্থানীয়রা জানতেন, তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত নন। সত্যের কোনো মূল্য ছিল না। তাকে গ্রেফতার করা হলো, কারাগারে পাঠানো হলো, এবং সেই মামলাগুলোর ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হলো। একটি ভোট, একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, একটি জনগণের আস্থা—সবকিছু মুহূর্তে অর্থহীন হয়ে গেল।
এটি কোনো ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার পরিবার একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। কোথাও দেখা গেছে, পরিবারের একজন সদস্য রাজনৈতিকভাবে টার্গেট হওয়ার পর তার সন্তানকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। সেই সন্তান হয়তো একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, হয়তো একজন চাকরিজীবী, যার সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। কিন্তু একটি মিথ্যা মামলার কারণে তার জীবন থেমে গেছে। সে হয়ে গেছে একজন আসামি, সমাজের চোখে একজন সন্দেহভাজন, নিজের স্বপ্নের কাছেই অপরিচিত।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের অসাংবিধানিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। সেই স্বীকারোক্তি, যা ভয়ের, নির্যাতনের এবং অসহায়ত্বের মধ্যে তৈরি, সেটিই আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেই স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে আদালতে সাজা দেওয়া হয়েছে—কেউ পেয়েছেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, কেউবা মৃত্যুদণ্ড। একজন মানুষ, যার কোনো অপরাধ ছিল না, সে হয়ে গেছে দোষী। তার জীবন শেষ হয়ে গেছে একটি কাগজের মাধ্যমে, যা সে নিজের ইচ্ছায় দেয়নি।
এই বেদনা শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়েছে পুরো পরিবারে। একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন কারাগারে চলে যায়, তার পরিবারের অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সংসারের চাকা থেমে যায়। সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক পরিবার তাদের জমি ও সম্পত্তি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে শুধু মামলার খরচ চালানোর জন্য। কেউ কেউ ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। পরিবারের সামাজিক মর্যাদা, সম্মান, এবং মানসিক শান্তি—সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যখন একটি পরিবারের প্রধান ব্যক্তি অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত হন, তখন শুধু তার জীবন নয়, তার সন্তানের ভবিষ্যৎ, স্ত্রীর সম্মান, পরিবারের সামাজিক অবস্থান—সবকিছু ভেঙে পড়ে। সমাজে তাদের দিকে তাকানোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। তারা হয়ে ওঠেন ‘মামলার পরিবার’, একটি কলঙ্কের প্রতীক, যদিও সেই কলঙ্কের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
এমনও ঘটেছে যে, একজন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তার পরিবারকে চাপে ফেলার জন্য তার ভাই, যিনি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ আনা হয়েছে। একজন শিক্ষকের জন্য এর চেয়ে বড় অপমান আর কী হতে পারে? তার ছাত্ররা, সহকর্মীরা, সমাজ—সবাই তাকে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে দেখেছে। পরে প্রমাণিত হয়েছে অভিযোগটি মিথ্যা, কিন্তু ইতিমধ্যেই ক্ষতি হয়েছে।
এই বাস্তবতা শুধু অতীতের নয়। আজও অনেক মানুষ এই অন্ধকারের মধ্যে বসবাস করছেন। কারাগারে আছেন, জামিনের আশায় দিন গুনছেন, আদালতের বারান্দায় বছরের পর বছর ঘুরছেন। তাদের জীবনে সময় থেমে গেছে, কিন্তু পৃথিবী থেমে নেই। সন্তান বড় হচ্ছে, বাবা-মা বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তারা এখনো অপেক্ষা করছেন—ন্যায়বিচারের জন্য, মুক্তির জন্য, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য।
আইনি প্রক্রিয়া এমন এক জটিল জালে পরিণত হয়েছে, যেখানে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। একজন কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, একজন যৌথ পরিবারের কর্তা—তাদের পক্ষে বছরের পর বছর মামলা চালানো, আইনজীবীর খরচ বহন করা, আদালতে যাতায়াত করা—সবই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তারা ধীরে ধীরে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, এবং তাদের আশা প্রতিদিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। যদি একটি দেশের শাসন ও বিচারব্যবস্থা মানুষের আস্থা হারায়, দেশের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। মানুষ যদি বিশ্বাস হারায় যে তারা ন্যায়বিচার পাবে, তাহলে আইন আর কোনো সম্মান পায় না। সমাজে অস্থিরতা জন্ম নেয়, অবিশ্বাস জাগে, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
বর্তমান সময়ে, যখন নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তখন প্রান্তিক মানুষের কথা বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। তারা কোনো বড় রাজনৈতিক শক্তি নয়, তারা সাধারণ মানুষ, যারা শুধু ন্যায়ভিত্তিক জীবন চায়। তাদের কণ্ঠস্বর হয়তো জোরালো নয়, কিন্তু তাদের কষ্ট গভীর। তাদের কান্না নিঃশব্দ, তবুও তা অস্বীকার করা যায় না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সরকার যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়, তাহলে এখনই সময় এই বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যেখানে বিচারপতি, মানবাধিকার কর্মী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা একত্রিত হয়ে এই মামলাগুলো পর্যালোচনা করবেন। প্রতিটি মামলা যাচাই করা উচিত—কোনটি প্রকৃত অপরাধ এবং কোনটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যারা নির্দোষ, তাদের দ্রুত মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মুক্তি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা—সবকিছু পুনঃস্থাপন করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই মানুষগুলোকে সমাজে পুনরায় সম্মানের সঙ্গে বাঁচার সুযোগ দেওয়া। মিথ্যা মামলার দাগ শুধু আদালতের রায় দিয়ে মুছে যায় না। মানুষের মনে, সমাজের দৃষ্টিতে এটি থেকে যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের জন্য সামাজিক সচেতনতা এবং রাষ্ট্রের উদ্যোগ অপরিহার্য।
আজ সময় এসেছে সেই অদেখা, অশ্রুত মানুষের গল্পগুলো শোনার। সময় এসেছে তাদের পাশে দাঁড়ানোর, তাদের কষ্ট স্বীকার করার, এবং তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার। কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার ক্ষমতায় নয়, তার মানুষের আস্থায়। এই আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সাহসী, মানবিক এবং ন্যায়ভিত্তিক পদক্ষেপ।
যদি আজ এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো আগামীকাল আর একটি মা তার সন্তানের জন্য কান্না করবেন না। একটি শিশু তার বাবার জন্য অপেক্ষা করতে করতে বড় হবে না। একটি পরিবার আবার স্বপ্ন দেখতে পারবে। আর একটি সমাজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে—যেখানে ন্যায়বিচার শুধু একটি শব্দ নয়, একটি বাস্তবতা।
এই চিঠি সেই বাস্তবতার জন্য একটি আহ্বান। একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্য একটি অনুরোধ। একটি ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রার্থনা।
প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
একটি নীরব আর্তনাদ: মানুষের বেদনা ও ন্যায়ের জন্য একটি খোলা চিঠি
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
২৯ মার্চ (রবিবার), ২০২৬, ১০ঃ০৮ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
