আমেরিকা-ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের অপরাধ ছড়াচ্ছে আতঙ্ক

বিদেশে কয়েকজনের অপরাধে লজ্জায় পুরো জাতি

আমেরিকা-ইউরোপ-মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের অপরাধ ছড়াচ্ছে আতঙ্ক

ফন্ট সাইজ:

বিদেশে বাংলাদেশিরা একসময় ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জন করা, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, দেশের রিজার্ভে ডলার পাঠানো—এই ছিল তাদের পরিচয়। মধ্যপ্রাচ্যের নির্মাণশ্রমিক, ইতালির রেস্টুরেন্ট কর্মী, আমেরিকার গ্যাস স্টেশন কর্মচারী, লন্ডনের কেয়ারগিভার—সবখানেই বাংলাদেশি মানে ছিল কষ্ট সহ্য করা মানুষ। কিন্তু এখন সেই নামের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে নতুন এক আতঙ্ক—অপরাধ, প্রতারণা, যৌন সহিংসতা, মাদক, অপহরণ, জালিয়াতি, ব্যাংক চুরি, মুক্তিপণ।

কথাটা যতই কষ্টের হোক, বাস্তবতা হলো—বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এখন বড় ধরনের ধাক্কার মুখে। আর ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এটা আর গোপন বা লোকচক্ষুর আড়ালের সমস্যা নয়। এখন তা আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সংস্থার নথিতে, বিদেশি মিডিয়ার শিরোনামে, ইমিগ্রেশন অফিসারের সন্দেহের তালিকায়, এমনকি ভিসা নীতির আলোচনাতেও উঠে আসছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা শুনলেই গা শিউরে ওঠে—শিশু নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, মাদক, প্রতারণা, অস্ত্র, জালিয়াতি, চুরি, হামলা।
এদের ‘খারাপের চেয়েও খারাপ’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। এই একটি বাক্যই বাংলাদেশের জন্য কত বড় অপমান—তা কি আমরা উপলব্ধি করছি?

একটু ভেবে দেখুন—একজন আমেরিকান, একজন ইতালিয়ান, একজন সৌদি কর্মকর্তা, একজন ইউরোপিয়ান ভিসা অফিসার যখন “Bangladeshi” শব্দটি দেখবেন, তখন তার মাথায় প্রথমে কী আসবে? পরিশ্রমী মানুষ? নাকি রিস্ক ফ্যাক্টর? এটাই এখন সবচেয়ে বড় বিপদ।

বিদেশে একজন বাংলাদেশি অপরাধ করলে আদালতে শাস্তি পায় একজন। কিন্তু সামাজিক শাস্তি পায় লাখো মানুষ।

যে ছেলেটি সত্যিকারের স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে আমেরিকায় যেতে চায়, তাকে বাড়তি সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
যে মেয়ে ইউরোপে নার্সিং চাকরির জন্য আবেদন করে, তার কাগজপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই হয়।
যে শ্রমিক সৌদি বা ইতালিতে বৈধভাবে কাজ করতে যায়, তাকে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা সহ্য করতে হয়। অর্থাৎ অপরাধী কয়েকজন, কিন্তু মাশুল দেয় পুরো জাতি।

এটাই আন্তর্জাতিক বাস্তবতা। কোনো দেশ আপনার কবিতা পড়ে আপনাকে বিচার করে না। তারা বিচার করে—আপনার নাগরিক বিদেশে গিয়ে কী করছে।

আর সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য—সব জায়গায় এখন অভিবাসন আর নিরাপত্তা একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। ফলে কোনো দেশের নাগরিক যদি বেশি করে অপরাধ, প্রতারণা, জালিয়াতি, ওয়েলফেয়ার ফ্রড, ভিসা অপব্যবহার বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে—সেই দেশের সাধারণ মানুষও চাপে পড়ে।

ইতালির ব্যাংক ভল্ট থেকে সৌদির অপহরণ—লজ্জার তালিকা লম্বা হচ্ছে: একটি ঘটনা, দুটি ঘটনা, তিনটি ঘটনা—এভাবে যখন তালিকা বড় হয়, তখন আর তাকে “বিচ্ছিন্ন” বলা যায় না। ইতালির মিলানে ইউনিক্রেডিট ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে চুরির চেষ্টার অভিযোগে এক বাংলাদেশির গ্রেপ্তার—এটি কেবল একটি অপরাধ সংবাদ নয়; এটি একটি প্রতীক। এটি দেখায়, কিছু মানুষ বিদেশে গিয়ে কেবল কাজের সন্ধানে নয়, অপরাধের শর্টকাটেও ঢুকে পড়ছে।

সৌদি আরবের ঘটনাটি আরও ভয়াবহ। এক প্রবাসী বাংলাদেশিকে অপহরণ করা হলো, তার পরিবার থেকে দেশে বসে মুক্তিপণ আদায় করা হলো, লেনদেন হলো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে, আর এর সঙ্গে যুক্ত হলো বাংলাদেশভিত্তিক একটি চক্র। এর মানে কী? এর মানে, এখন অপরাধও ট্রান্সন্যাশনাল—দেশে বসে বিদেশে থাকা মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে। অর্থাৎ, কিছু বাংলাদেশি কেবল বিদেশে গিয়ে অপরাধ করছে না, বরং বাংলাদেশ-বিদেশ মিলিয়ে অপরাধের নেটওয়ার্কও গড়ে তুলছে।

এটি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, অর্থপাচার এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।

কেন এমন হচ্ছে? উত্তরটা শুধু দারিদ্র্য নয়, আমরা প্রায়ই খুব সহজ উত্তর খুঁজি—“অভাবের কারণে করেছে”, “কাগজ ছিল না”, “কাজ পায়নি”, “পরিস্থিতি খারাপ ছিল”। হ্যাঁ, এসব কারণ আছে। কিন্তু এটাই পুরো সত্য নয়।

কারণ, বিদেশে লাখ লাখ বাংলাদেশি কঠিন পরিস্থিতিতেও সৎভাবে বেঁচে আছেন। তাহলে কিছু মানুষ কেন অপরাধে জড়ায়?

এক. অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার মূল্য: যে যুবক ১২-১৫ লাখ টাকা ঋণ করে, জমি বিক্রি করে, দালালের পেছনে ছুটে বিদেশ যায়, তার মাথায় প্রথম দিন থেকেই চাপ—যেভাবেই হোক টাকা তুলতে হবে।
কাজ না পেলে, কাগজ না পেলে, বেতন না পেলে—সে সহজেই অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে।

দুই. দ্রুত বড়লোক হওয়ার রোগ: আমাদের সমাজে এক ভয়াবহ মানসিকতা গড়ে উঠেছে—বিদেশে গেলে টাকাওয়ালা হতেই হবে। পরিবার ভাবে, ছেলে আমেরিকায় গেছে মানেই ডলার ঝরবে। গ্রাম ভাবে, সৌদি গেছে মানেই জমি কিনবে। ফেসবুক দেখে আত্মীয় ভাবে, ইতালিতে মানেই ইউরো কুড়াচ্ছে। এই সামাজিক চাপ অনেককে সৎ পথ ছেড়ে শর্টকাটে ঠেলে দেয়।

তিন. প্রবাসের ভেতরে অপরাধী নেটওয়ার্ক: বিদেশে সব বাংলাদেশি ফেরেশতা নন। অনেক জায়গায় আছে দালালচক্র, জাল কাগজের ব্যবসা, অবৈধ বাসা ভাড়া সিন্ডিকেট, হুন্ডি নেটওয়ার্ক, মাদক রুট, এমনকি দুর্বল অভিবাসীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের গ্রুপ। নতুন যারা যায়, তারা এই অন্ধকার জগতের শিকার হয়—কখনো স্বেচ্ছায়, কখনো বাধ্য হয়ে।

চার. মূল্যবোধের সংকট: সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যটি হলো—কিছু মানুষ কেবল লোভী, নষ্ট এবং অপরাধপ্রবণ। এখানে দারিদ্র্য, কষ্ট বা অভিবাসনের অজুহাত দিয়ে সব ধুয়ে ফেলা যাবে না। যে শিশু নির্যাতন করে, যে যৌন অপরাধ করে, যে মুক্তিপণের ভাগ নেয়, যে জালিয়াতি করে—সে শুধু “পরিস্থিতির শিকার” নয়; সে অপরাধী। এবং তাকে অপরাধী বলতেই হবে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি: ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়টাই ঝুঁকিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এইসব ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কী?

ক্ষতি শুধু এই নয় যে, কিছু লোক জেলে যাবে। ক্ষতি হলো—বাংলাদেশি পরিচয়টাই ধীরে ধীরে সন্দেহের মধ্যে ঢুকে পড়ছে।

আজ ভিসা অফিসার কাগজপত্র আরও বেশি ঘাঁটবেন। আগামীকাল নিয়োগদাতা ভাববেন—বাংলাদেশি নিলে ঝামেলা হবে না তো? পরশুদিন বাড়িওয়ালা বলবেন—না, অন্য কাউকে দেবো। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়, কোম্পানি, ইমিগ্রেশন, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও তৈরি হবে অদৃশ্য দেয়াল। একটি দেশের ভাবমূর্তি একদিনে নষ্ট হয় না। ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়। আর যখন ভেঙে পড়ে, তখন তা আবার দাঁড় করাতে লাগে দশকের পর দশক।

রাষ্ট্র কি শুধু রেমিট্যান্স নেবে, দায় নেবে না? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এখানেও দায় আছে। কারণ আমরা প্রবাসীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স চাই, কিন্তু তাদের প্রস্তুত করি না।

বিদেশে যাওয়ার আগে কি কাউকে শেখানো হয়—কোন কাজ করলে বিদেশে সরাসরি ফৌজদারি মামলা হবে?
কীভাবে ডিজিটাল প্রতারণা এড়াতে হবে? কীভাবে স্থানীয় আইন মানতে হবে? যৌন অপরাধ, মাদক, জালিয়াতি, ট্যাক্স ফাঁকি, ভিসা শর্ত ভঙ্গ—এসবের পরিণতি কী?

বাস্তবতা হলো—না, শেখানো হয় না। মানুষকে আমরা প্লেনে তুলে দিই, কিন্তু বিশ্বে টিকে থাকার জন্য নৈতিক, আইনি ও সামাজিক প্রশিক্ষণ দিই না। এটা বন্ধ করতে হবে।

বিদেশে যাওয়ার আগে বাধ্যতামূলক প্রবাস জীবন ও আইন শিক্ষা চালু করতে হবে। দূতাবাসগুলোকে শুধু পাসপোর্ট নবায়নের অফিস না বানিয়ে, প্রবাসী সাপোর্ট ও রিস্ক মনিটরিং সেন্টার বানাতে হবে। অপরাধে জড়িত বাংলাদেশি নেটওয়ার্কের তথ্য দ্রুত বাংলাদেশে পাঠিয়ে যৌথ তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

বাংলাদেশে একটি বিপজ্জনক আবেগ আছে—বিদেশে থাকে মানেই সম্মানিত। এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।

প্রবাসী হওয়া কোনো সার্টিফিকেট নয়। সৎ প্রবাসী সম্মান পাবেন। কিন্তু যে বিদেশে গিয়ে ধর্ষণ, মাদক, প্রতারণা, অপহরণ, জালিয়াতি, চুরি বা শিশু নির্যাতনে জড়াবে—সে দেশের মুখে থুথু ছিটিয়েছে।

এখানে কোনো আবেগ নয়, কোনো ছাড় নয়, কোনো “মান-সম্মান” নয়—জিরো টলারেন্স লাগবে। কারণ, অপরাধীকে “আমাদের লোক” বলে আড়াল করার সংস্কৃতি শেষ পর্যন্ত পুরো জাতিকেই কলঙ্কিত করে।

সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হলো—এটি শুধু কিছু অপরাধীর গল্প নয়, এটি আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের সংকট। আমরা কি কেবল ডলারের অঙ্ক দেখবো, নাকি দেখবো—সেই ডলার আনার নামে কোথাও বাংলাদেশের পতাকা অপরাধের ফাইলে আটকে যাচ্ছে?

আমরা কি কেবল বলবো—“কয়েকজনের জন্য সবাইকে দোষ দেয়া ঠিক নয়”, নাকি এটাও বলবো—“কয়েকজনের জন্য পুরো জাতির সম্মান নষ্ট হতে দেয়া যাবে না”?

এখনো সময় আছে। রাষ্ট্র যদি কঠোর হয়, সমাজ যদি সৎ হয়, পরিবার যদি চাপ কমায়, প্রবাসী কমিউনিটি যদি অপরাধীদের বয়কট করে—তাহলে পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব। নইলে সামনে যা আসছে, তা আরও ভয়াবহ।

কারণ, বিদেশের মাটিতে আজ যদি বাংলাদেশি নামটি সন্দেহের তালিকায় ওঠে, কাল তা ভিসা নীতিতে,
পরশু কর্মসংস্থানে, আর তার পরদিন জাতীয় মর্যাদায় আঘাত করবে।

প্রশ্ন একটাই—আমরা কি জেগে উঠবো, নাকি কয়েকজন অপরাধীর হাতে পুরো জাতির সুনাম জিম্মি থাকতে দেবো?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন