‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী’- আবিদা সুলতানার গাওয়া এই গানটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা-সবার মনকে আনন্দে উদ্বেলিত করতো। কারণ এই গানটি ছিল দেশের নদী-নালা, খাল-বিল, সবুজ মাঠ, বন-বনানি ও মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা আর সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু দেশের সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনা দেশকে এক রূঢ় বাস্তবতার সামনে এমন অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে- যেখানে স্বপ্নের দেশটা যেন আজ মৃত্যুপুরী। মানুষের জীবনের মূল্য এখানে যে কতো সস্তা তা এদেশে যারা না থাকেন তারা ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না। ধর্মীয় উৎসব পালন করতে গেলেও এদেশে শত শত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। এবারের হিসাবটাই বিবেচনায় আনা যাক। এই ঈদ যাত্রায় আটদিনে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৪ জনের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করেছে প্রথম আলো। এতে ৬ শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার খবরও রয়েছে। ঈদকে কেন্দ্র করে বাড়তি চাপ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, দীর্ঘযাত্রা, চালকের ক্লান্তি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, খানাখন্দ সড়ক ও দুর্বল তদারকি সহ নানা অব্যবস্থাপনা এই দুর্ঘটনার মূল কারণ। সরকারি সংস্থা খোদ বিআরটিএ কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যেও আমাদের চোখ চরকগাছ। তারাও এই আটদিনে মৃত্যুসংখ্যা ১৩২ বলে জানিয়েছে। বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুসংখ্যার চেয়ে সরকারি হিসাবে মৃত্যু কম দেখানো আমাদের সরকারি সংস্থাগুলোর বহু পুরনো অভ্যাস। এদেশে কোনো দুর্ঘটনায় হতাহত যত কম দেখানো যায় সরকারের সাফল্যের পারদ তত ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে আছে বলে বিবেচনায় ধরা হয়। এ বিষয়ে কথা বলবো নিবন্ধের একদম শেষদিকে। তার আগে গত বুধবার রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাটে বাস দুর্ঘটনা নিয়ে কথা না বললেই নয়। জানা যায়, বাসটি যাত্রা শুরু করেছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে। ঈদ উদ্যাপন শেষে রাজধানী ঢাকার কর্মস্থলে ফেরার তোড়জোড় সব সময়ই থাকে। বরাবরের মতো এবারো ঢাকামুখী রাস্তা এখনো ব্যস্ত। সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ছয়জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেও রাস্তায় বিভিন্ন কাউন্টার থেকে লোক উঠতে উঠতে চালক, সুপারভাইজার ও চালকের সহকারীসহ অন্তত ৫০ জন যাত্রী বাসে ছিলেন বলে জানায় বিভিন্ন গণমাধ্যম।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিবহনের ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মো. মনির হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী বিকাল ৫টার কিছুক্ষণ পর সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে আসে। এ সময় ঘাটে থাকা একটি ফেরি যানবাহন নিয়ে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। অল্পের জন্য উঠতে না পারায় অপর ফেরির জন্য বাসটি অপেক্ষা করছিল। সোয়া ৫টার দিকে ওই ঘাটে ‘হাসনা হেনা’ নামের একটি ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি এসে সজোরে পন্টুনে আঘাত করে। এ সময় নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বাসটি চোখের নিমিষেই পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। চোখের সামনে স্বজন হারানোর কান্নায় ভারি হয় ফেরিঘাট এলাকার আকাশ-বাতাস। পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ধারণকৃত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনা ঘটার ঠিক আগে কয়েকজন যাত্রী বাস থেকে নামলেও ড্রাইভারসহ বাকিরা নামেননি। কান্নার রোল আর শোকের মাতমে প্রকম্পিত হয় গোটা দেশ। উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা এসে প্রায় ৬ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানে বাসটিকে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করে। তল্লাশি অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় একের পর এক মরদেহ। এই লেখক যখন নিবন্ধ লিখতে বসেছেন, তখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পদ্মা দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রমত্তা নদী। এর স্রোত খুবই প্রবল, দ্রুতগামী ও পরিবর্তনশীল। পানির নিচে ঘূর্ণিস্রোত তৈরি করা এই নদীর স্বভাব। তাই বাকি যাত্রীদের নিথর দেহ কোথায় কী অবস্থায় আছে, তা আঁচ করা কঠিন। অভিযান চালালেও শেষ পর্যন্ত সংখ্যাটি কী দাঁড়ায়- তা আগে থেকে বলা মুশকিল। এই যে আজকের এই দুর্ঘটনায় এত এত প্রাণহানি হলো- তা কি শুধু ভাগ্যের নিয়তি, নাকি এটি স্পষ্টত কোনো অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার ফল? দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের এ দুর্ঘটনা নিয়েও কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই। বাসটি মুহূর্তের মধ্যে যেভাবে চোখের পলকে সোজাসুজি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে গেল, ফেরিতে ওঠার পন্টুনে যদি লোহার শক্ত রেলিং বা যান নিরাপত্তা বেষ্টনি থাকতো তাহলে ঘটনা অন্যরকমও হতে পারতো। হাসনা হেনা নামের ছোট একটি ফেরি এত সজোরে পন্টুনে আঘাত করলো কেন? ওই ফেরি চালনার দায়িত্বে কারা ছিল? ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে সব যাত্রী নামানো হয়নি কেন? চালক যেহেতু বাসের ভেতরই ছিল তাহলে বাসটির কি ব্র্যাক ফেইলজনিত যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল? এই সকল উত্তর পাওয়ার জন্য দুর্ঘটনার পর বরাবরই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, এক্ষেত্রেও হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- তদন্ত কমিটি গঠিত হয়ে শুরুর দিকে তোড়জোড় চললেও একটা সময় পর তদন্তের নথি নিস্তেজ হয়ে যায়, মানুষ সব ভুলে যায়। অতীত ঘটনা ঘাঁটলে দেখা যায়, এদেশে দুর্ঘটনা শেষে তদন্ত কমিটি গঠন ফরমালিটি রক্ষার নামে নামমাত্র একটি উদ্যোগ। তারচেয়ে জরুরি হলো দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেজন্য নিয়মিত কঠোর নজরদারি, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের সড়কপথ ও নৌপথ শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ ও বিআইডব্লিউটিএ- নীতিগতভাবে দু’টি শক্তিশালী সংস্থা হলেও বাস্তবে উভয়কে ‘ঘটনার পর জেগে ওঠা নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে দেখা যায়। ঘটনা ঘটার পর একে-অন্যের ওপর দায় চাপানো মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আমাদের দেশে সারা বছর যান চলাচলে এক অস্থির প্রতিযোগিতা লক্ষণীয়। রেললাইন ক্রসিংয়ে কোন বাস কার আগে যাবে বা ফেরিঘাটে কোন যান কার আগে ফেরিতে উঠবে বা নামবে তার লাগামহীন প্রতিযোগিতার প্রতি উপরোক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা। ঈদের দিন দিবাগত রাতে কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে উঠে পড়া একটি বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষের ঘটনায় মরে যায় ১২টি তাজা প্রাণ তার বাস্তব নিদর্শন।
বাংলাদেশের পরিবহন খাতে যে চরম অব্যবস্থাপনা, তার বহু উদাহরণ আছে। এবারের দুর্ঘটনায় বাস যাত্রীদের বীমা ব্যবস্থা ছিল কিনা, বাসটির রুট পারমিট ছিল কিনা, বাসের ফিটনেস সনদ ছিল কিনা কিংবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিল কিনা- এ জাতীয় প্রশ্ন ঘুরেফিরে বারবার উঁকি দিচ্ছে। নিহতদের জন্য ২৫ হাজার ও আহতদের জন্য ১৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের আশ্বাস জেলা প্রশাসন দিয়েছে। কিন্তু সড়ক পরিবহন আইনে বিশেষ বিধানের মাধ্যমে সংরক্ষিত তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ করা হবে কিনা তা শোনা যায়নি। ওই তহবিলে কোটি কোটি টাকা আছে বলে জানা যায়। হতাহতদের স্বজনরা এই তহবিল থেকে সাহায্য না পেলে এই তহবিল গঠনের মকসদ কী?
উন্নত দেশে বাস বা যাত্রীবাহী যানবাহনকে ফেরির মাধ্যমে নদীপার করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার প্রচলন আছে। যেমন, ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীসমেত বাসের ওজন যাচাই বা ফেরির ভারসাম্য বজায় রাখতে নির্দিষ্ট স্থানে পার্ক করার বিষয়ে জোর দেয়া অথবা বাস বা যানবাহনের স্টিয়ারিং লক বা হ্যান্ডব্রেক যাচাই করা ইত্যাদি। ঢেউয়ে বা কোনো অপ্রত্যাশিত ধাক্কাতে গাড়ি যেন না নড়ে সেজন্য পার্কিং ব্রেক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়- যার কোনোটিই আমাদের দেশে তেমন চোখে পড়ে না। তাই পদ্মার ফেরিঘাটের এই বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি শুধু নিছক দুর্ঘটনার নাম দিয়ে চ্যাপ্টার শেষ করলে হবে না। এটি নদীপথ ও সড়কপথের নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের দায়িত্বহীনতার ও অব্যবস্থাপনার দিকেও ইঙ্গিত দেয়। দেশের নদী পদ্মা আমাদের জীবন ও জীবিকার অন্যতম উৎস, মৃত্যু উপত্যকা হতে পারে না।
দেশে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এ সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তার বাস্তবায়নে বিভিন্ন সময়ে গড়িমসি লক্ষ্য করা গেছে। আইন থাকলেও বিগত সরকারের কেউ সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। ফলে আইন প্রয়োগে শৈথিল্য ছিল বারবার। দুর্ঘটনার জন্য নিয়তি ছাড়া জোরালোভাবে সরাসরি কাউকে দায়ী করতে দেখা যায়নি বা দুর্ঘটনা ঘটার কারণে অপরাধীর ওপর বড় শাস্তির নমুনাও পাওয়া যায়নি। দেশ এখন নতুন সরকার ও নতুন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। দুর্ঘটনা হ্রাসে তিনি কী কী পদক্ষেপ নেন- তাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও গবেষক
Email: [email protected]

Saiful Islam
২ মাস আগেঅসাধারণ লেখনী।মানবিকতার ভিতরকার অস্ফুট কথাগুলো ফুটিয়ে তুলেছেন।আপনার মর্মন্তুদ লেখা হ্নদয়ে দাগ কেটেছে।