বাংলাদেশে বর্তমানে জ্বালানি তেল কেন্দ্রিক যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তা আস্তে আস্তে গভীর মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অস্থিতিশীলতা বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা যখন বিশ্ববাজারকে উত্তপ্ত করে তুলছে তখন তার ঢেউ এসে লেগেছে আমাদের স্থানীয় পাম্পগুলোতেও। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস এবং পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। এমন দ্বিমুখী তথ্যে মূলত সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি এবং ভীতি তৈরি করেছে। যখন কোনো রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে বলা হয় যে তেলের অভাব নেই কিন্তু বাস্তবে গ্রাহক পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছে না অথবা দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তখন আস্থার সংকট তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই আস্থার সংকট থেকেই জন্ম নেয় প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্রয়ের প্রবণতা। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশন রাজশাহী বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, একটি রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রাখতে হলে কেবল মজুত থাকলেই চলে না বরং সেই মজুতের সুষ্ঠু বণ্টন এবং জনগণের সামনে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা অপরিহার্য। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় প্রথম এবং প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির একটি স্বচ্ছ ও বিস্তারিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। জনগণকে স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন যে বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে কতদিন চলা সম্ভব এবং আমদানির ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদি বাধার আশঙ্কা আছে কি না। লুকোচুরি বা অস্পষ্টতা কেবল গুজবকেই ডালপালা মেলতে সাহায্য করে যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটায়। তাই সরকারকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিং এবং ডাটা ভিত্তিক তথ্য প্রদান করে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে হবে।
আব্দুল জলিল লকডাউন সিস্টেম বা এলাকাভিত্তিক বাইক চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন। বিষয়টি কঠোর মনে হলেও আপৎকালীন সময়ে এটি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশে বিশেষ করে শহর অঞ্চলে মোটরসাইকেলের সংখ্যা গত কয়েক বছরে জ্যামিতিক হারে বেড়েছে। গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত বাইকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু যখন জ্বালানি সংকটের মতো জাতীয় বিপর্যয় সামনে আসে তখন ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। ভারতের কিছু রাজ্যে যেমন জ্বালানি সাশ্রয়ে জোড় এবং বিজোড় সংখ্যার প্লেট অনুযায়ী গাড়ি চলাচলের নিয়ম করা হয়েছিল অথবা এলাকাভিত্তিক রেশনিং করা হয়েছিল ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। সপ্তাহে নির্দিষ্ট কিছু দিন নির্দিষ্ট এলাকায় বাইক চলাচল সীমিত রাখা হলে তেলের ওপর চাপ এক ধাক্কায় অনেকটা কমে আসবে। এই পদক্ষেপটি সফল করতে হলে সরকারকে শক্ত অবস্থানে যেতে হবে। যারা নিতান্তই বিনোদন বা অপ্রয়োজনে রাস্তায় বাইক নিয়ে বের হচ্ছেন তাদের নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে জরিমানার আওতায় আনতে হবে। তবে এই ধরনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের আগে একটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি আর সেটি হলো যারা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তাদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। চিকিৎসক, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিক এবং জরুরি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য বিশেষ কার্ড বা পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে আলাদা লাইনের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এতে করে জরুরি সেবাগুলো সচল থাকবে এবং বিশৃঙ্খলা অনেকাংশেই কমে আসবে।
বর্তমান এই সংকট থেকে উত্তরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থাকে গণপরিবহন মুখী করা। বাংলাদেশে বড় শহরগুলোতে মানুষ এককভাবে বাইক ব্যবহার করতে পছন্দ করে যা জ্বালানি খরচের দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একজন ব্যক্তি একটি বাইকে করে যে পথ অতিক্রম করেন সেখানে যে পরিমাণ তেল খরচ হয় তা যদি একটি বাসের যাত্রী সংখ্যার অনুপাতে হিসাব করা হয় তবে দেখা যাবে বাইক চালানো কয়েক গুণ বেশি ব্যয়সাধ্য এবং জ্বালানি অপচয়কারী। তাই এই সময়ে সরকারকে বিআরটিসি বা সরকারি বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেগুলোকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি পরিবহন মালিকদের সাথে আলোচনা করে ভাড়ার নৈরাজ্য বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করতে হবে যে বাইক ছাড়াও তারা সহজে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন। মানুষ যখন দেখবে যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যাতায়াত করা সহজ এবং সাশ্রয়ী তখন তারা এমনিতেই ব্যক্তিগত বাইক বের করা কমিয়ে দেবে। যারা অপ্রয়োজনে বাইক নিয়ে ঘুরছেন তাদের ঘরে ফেরানোর জন্য একটি সামাজিক সচেতনতা এবং প্রশাসনিক নজরদারি উভয়ই জোড়ালোভাবে শুরু করতে হবে। পাম্পগুলোতে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে তা দমনে পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বর্তমানে একটি প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। তেলের পাম্পগুলো যেন কোনোভাবেই যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে মানুষ পাম্পে গিয়ে বোতলে করে তেল নেয়ার চেষ্টা করছে অথবা অতিরিক্ত তেল ড্রামে ভরে মজুদের চেষ্টা করছে। এই ধরনের মজুতদারি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে কারণ একজনের অতিরিক্ত মজুত অন্যজনের হাহাকারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সরকার এবং পাম্প মালিকদের মধ্যে যে তথ্যের ফারাক রয়েছে তা নিরসনে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। এই টাস্কফোর্সে বিপিসি বা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের প্রতিনিধি, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং পাম্প মালিকদের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিদিনের সরবরাহ এবং চাহিদার হিসাব যেন জনসম্মুখে থাকে তার জন্য একটি ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করা যেতে পারে। যখন গ্রাহক দেখতে পাবেন যে তার এলাকার পাম্পে কতটুকু তেল আছে এবং কখন পরবর্তী লট আসবে তখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার হার কমে আসবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে তেলের রেশনিং করাও সম্ভব হতে পারে।
যেমন প্রতিজন বাইকার সপ্তাহে নির্দিষ্ট লিটারের বেশি তেল নিতে পারবেন না এমন একটি নিয়ম অ্যাপের মাধ্যমে বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। এতে করে প্যানিক বায়িং বন্ধ হবে এবং সমবণ্টন নিশ্চিত হবে। আমরা যদি বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকাই তবে দেখব যে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভয় কাজ করছে যে ভবিষ্যতে হয়তো তেল একেবারেই পাওয়া যাবে না। এই ভয় দূর করার জন্য কেবল মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয় বরং কাজের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে। ভারত যে মডেলটি গ্রহণ করেছে সেখানে তারা এলাকাভিত্তিক পাম্পগুলো ভাগ করে দিয়েছিল এবং জরুরি সেবার জন্য আলাদা পয়েন্ট নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ সরকার যদি এই প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে তবে এই আপৎকালীন সময়টি পার করা অনেক সহজ হবে।
জ্বালানি তেলের এই সংকট পরিবহনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পরিবহনের খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বেড়ে যায় যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। তাই বাইকের মতো ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা হলে সেই সাশ্রয়কৃত তেল ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের মতো পণ্যবাহী যানে ব্যবহার করা যাবে যা পরোক্ষভাবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের এখন মিতব্যয়ী হওয়ার সময় এসেছে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির যে অনিশ্চয়তা তাতে সামনের দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ আরও বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই এখন থেকেই যদি আমরা কৃচ্ছ্রসাধন না করি তবে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হতে পারে।
সরকারকে বুঝতে হবে যে জনমনে অস্থিরতা কেবল তেলের অভাব থেকে আসে না বরং অব্যবস্থাপনা থেকেও আসে। পাম্প মালিকদের পক্ষ থেকে যখন বলা হয় সরবরাহ কম তখন সরকারের উচিত ছিল দ্রুত তদন্ত করে দেখা কেন সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। যদি পরিবহনে সমস্যা থাকে তবে তা সমাধান করা আর যদি মজুতদারির ঘটনা থাকে তবে সেখানে অভিযান চালানো। কেবল পর্যাপ্ত তেল আছে বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বলা যায় বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের এখন একটি সমন্বিত এবং কঠোর পরিকল্পনার দিকে যেতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বাইক চলাচল বন্ধ করা, জরুরি সেবা কর্মীদের জন্য আলাদা কার্ড সিস্টেম চালু করা এবং এলাকাভিত্তিক রেশনিং বা লকডাউন পদ্ধতি প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষকে এই সংকটে সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের বোঝাতে হবে যে এটি একটি সাময়িক পরিস্থিতি যা ধৈর্য এবং শৃঙ্খলার মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সরকার যদি আজই শক্ত অবস্থানে যায় এবং স্বচ্ছতার সাথে পরিস্থিতি পরিচালনা করে তবে অচিরেই পাম্পগুলোর সেই দীর্ঘ সারি কমে আসবে। পাম্প মালিক এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করে একযোগে কাজ করার এখনই সময়। যদি আমরা এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেই তবে এই বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে। জনগণের ভোগান্তি কমাতে হলে তথ্যের প্রবাহ সচল রাখা এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বাইকারদের এই লম্বা লাইন শুধু তেলের অভাবের প্রতীক নয় বরং এটি আমাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও প্রতীক।
