(গতকালের পর)
কোণঠাসা মধ্যবিত্তের নিষ্ক্রিয়তা
আমাদের সমাজে অবদমন বেশি হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণির। প্রতিটি সরকারের সময় হাজার হাজার তল্পিবাহক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে। ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে তাদেরকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। সমাজের কর্তৃত্ব-নেতৃত্ব দখল করেছে কালোটাকা ও পেশিশক্তি। যার কারণে সমাজ প্রগতির অন্যতম শক্তি মধ্যবিত্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। জাতীয় ইতিহাস, উৎসব, দিবস, যা সবার জন্য, তা মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণহীনতার কারণে সবার হয় নি। কতিপয়ের হাতে জিম্মি হয়ে রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও তাই। এটি শুধু পণ্ডিতদের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি বাংলাদেশির। যিনি পাটক্ষেতে কাজ করেন, যিনি নদীতে মাছ ধরেন, যিনি কারখানায় শ্রম দেন-তাদের কাছেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পৌঁছে দেয়া জরুরি। আর সেটা সম্ভব তখনই, যখন ইতিহাস হবে সহজ, সর্বজনীন, দলীয় বয়ানমুক্ত। যার চালিকা শক্তি হবে সমাজের মধ্যবিত্ত তথা শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, শেপাজীবী শ্রেণির মানুষজন।
সম্ভাবনার পথ
জাতিগত ইতিহাসের মতো ঐক্যের জায়গাটি বিভক্ত থাকলে আশার সব আলো নিভে যায় নি। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের আবহ থেকে যেভাবে গণতন্ত্রের উত্তরণ হয়েছে, সেভাবেই ঐক্যের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের উদ্ভাসন সম্ভব। আর তার জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, দলীয় ক্ষুদ্রতার বাইরে আসা এবং সমন্বিত মনোভাবে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা।
দলীয় বয়ানের বাইরে কী আসা সম্ভব?
প্রশ্ন হলো- বাংলাদেশের মতো অবিকশিত গণতান্ত্রিক চেতনার দেশে দলীয় অবস্থান ছেড়ে আসা আদৌ সম্ভব? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার তাহলে দলীয় বয়ানের বাইরে আসতে পারবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস?
আমরা প্রশ্নের উত্তরগুলোকে ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে চাই। ইচ্ছা করলেই তা সম্ভব। কিন্তু তা সম্ভব করতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। বিশেষত শক্তি ও ক্ষমতার বাইরে এসে দেখতে হবে ইতিহাসকে। এ জন্য যা দরকার, তা হলো:
১. তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চা: মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্র, প্রতিটি ব্যক্তির অবদান-সব কিছুকে তথ্যভিত্তিক ও প্রামাণ্যভিত্তিক কাঠামোতে আনা জরুরি।দলীয় দলিল নয়, প্রকৃত দলিল-দস্তাবেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানকে প্রাধান্য দিতে হবে।
২. অভিন্ন পাঠ্যপুস্তক: দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একই ও অভিন্নভাবে পড়ানো জরুরি।সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যপুস্তক বদলে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত, দলীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে নয়।
৩. গবেষণা প্রতিষ্ঠান: স্বাধীনভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান দরকার। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এক্ষেত্রে প্রশংসনীয় কাজ করছে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার পরিধি আরও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপ নেয়ার দরকার হতে পারে।
৪. মিডিয়ার ভূমিকা: গণমাধ্যমকে দলীয় বয়ান প্রশ্রয় না দিয়ে নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক ইতিহাস চর্চায় সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। যারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু দলীয় পরিচয় না থাকায় উপেক্ষিত, তাদের তুলে ধরা জরুরি।
৫. সাংস্কৃতিক উদ্যোগ: নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, ভাস্কর্য-সব মাধ্যমেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে তুলে ধরতে হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নিতে হবে যা সব ধর্ম-বর্ণ-দলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য।
৬. সরকার ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা: ইতিহাসের ক্ষেত্রে সরকার ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকতে হবে। ইতিহাস চর্চা বিশেষায়িত একাডেমিক কাজ, আমলাতন্ত্রের কোনো দায়িত্ব নেই এক্ষেত্রে। ক্ষমতার নিরিখে ও শক্তির মানদণ্ডে ইতিহাসকে দেখার যে তাঁবেদার সংস্কৃতি সরকারি কর্মকর্তা ও আমলাদের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তা নিরপেক্ষ ও সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার জন্য ক্ষতিকর। অতীতে মুক্তিযুদ্ধের বই রচনা, বই কেনা, প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে আমলাতন্ত্র কেবল ইতিহাস বিকৃতি ও দলীয়করণই করে নি, শত শত কোটি টাকার দুর্নীতিও করেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দুর্নীতিই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। আমলাদেরকে সময় ও সুযোগ বুঝে মুজিবপন্থি বা জিয়াপন্থি হওয়ার প্রবণতা ঠেকিয়ে তাদেরকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের আদেশানুয়ায়ী দক্ষতা, সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে নিজ নিজ কাজটি করার মধ্যেই ব্যস্ত রাখা দরকার। এটাই তাদের আসল কর্তব্য। রাজনীতি করা বা ইতিহাস চর্চা তাদের এখতিয়ারের বাইরে। সেটা তারা অবশ্যই করতে পারবেন। তবে তা অবসর গ্রহণের পর।
রাজনীতির বাইরে মুক্তবুদ্ধির চর্চা
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রকাশনি বন্দিত্ব ও রাজনীতির বাইরে নিয়ে যেতে হবে।এটি কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে সম্ভব নয়। মুক্তবুদ্ধির চর্চা হতে হবে অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক পর্যায়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ-সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যদি একবার সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও অভিন্ন কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেই ইতিহাসকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। বরং সমাজের মানুষ গতিশীল উদ্যোগে সেই ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ ও গৌরবদীপ্ত করতে থাকবে।
সপ্তম পর্ব: উপসংহার-মুক্তির পথ
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এখনো সঠিক পথের সন্ধানে রয়েছে। দলীয়ভাবে চাপানো বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত ইতিহাস রয়েছে মুক্তির অপেক্ষায়। যে ইতিহাস আমলাতন্ত্র ও দলীয় বয়ানের কারাগারে বন্দি, তার মুক্তি অত্যাবশ্যক। মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে যেসব প্রকৃত বীররা ইতিহাসের বর্ণনায় এখনো হয়ে আছেন উপেক্ষিত, তার অবসান দরকার। যেসব দলীয় লোকজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েও সমাজের নানা স্তরে আছেন সম্মানের আসনে, তাদেরকে শুদ্ধিকরণের মাধ্যমে অপসারিত করাও প্রয়োজন।
আমাদের বিভক্ত জাতিকে ঐক্যের পথে আনতে হলে প্রথমেই দরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুক্ত করা।ক্ষমতা ও শক্তির বলে দলীয় কর্তৃত্ব, গোষ্ঠীগত স্বার্থ, ব্যক্তিগত কৃতিত্ব জাহিরের এসব সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে একটি অভিন্ন ইতিহাস গড়ে তুলতে হবে- যেখানে সব ধারার মানুষের অবদান থাকবে, যেখানে কোনো দলীয় পতাকা থাকবে না, থাকবে শুধু একটি পতাকা-বাংলাদেশের পতাকা।
কিশোরগঞ্জের ডা. এ এ মাজহারুল হকের মতো যারা প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, ইত্তেফাকের মতিউর রহমান চৌধুরী ও আলমগীর হোসেনের মতো যারা দল করেননি বলে উপেক্ষিত হয়েছেন, তাদের অবদানকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। এরাই দেশমাতৃকার মুক্তির দিশারী। এরাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। দেশের সর্বত্র তারা রয়েছেন। তাদেরকে সামনে আনতে হবে। তাদের বীরোচিত অবদানকে সত্যনিষ্ঠভাবে ইতিহাসের অংশ করতে হবে। পাশাপাশি ভুয়া সার্টিফিকেটধারী ‘মুক্তিযোদ্ধাদের’ সঠিক তথ্য উদ্ঘাটন করে অযাচিত ইতিহাস ও অবস্থান থেকে অপসারণ করতে হবে।
আমরা যদি না পারি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুক্ত করতে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানবে না- কে সত্যিকারের বীর, কে ছিল ভণ্ড। তারা জানবে না-কীভাবে একাত্তরে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল লক্ষ লক্ষ মানুষ, কীভাবে গড়ে উঠেছিল এই দেশ। কীভাবে গ্রামেগঞ্জে, শহরে, বন্দরে উদ্বেলিত মানুষ একটি দেশের স্বপ্নে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিল। জীবনবাজি রেখে অর্জন করেছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ।
তাই এখনই সময়-দলীয় বয়ানের বাইরে আসার। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুক্ত করার। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল সকলের জন্য, সব দলের জন্য, সব ধর্মের মানুষের জন্য। সেই ইতিহাসও হওয়া উচিত সকলকে নিয়ে।
আমরা যদি ইতিহাসকে মুক্ত করতে পারি, তাহলেই আমরা সত্যিকার অর্থে মুক্ত হবো-দলীয় কর্তৃত্বের বেড়াজাল থেকে, গোষ্ঠীগত বিভেদ থেকে, অসত্যের বোঝা থেকে। তবেই স্বাধীনতার স্মৃতিময় মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা বলতে পারবো, আমরা
সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন: রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিকভাবে মুক্ত ও স্বাধীন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হোক আমাদের জাতির অমূল্য সম্পদ, কোনো দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা বা বড়াইয়ের কাহিনী নয়। হোক জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি, বিভাজনের হাতিয়ার নয়। নবতর রাজনৈতিক পরিসরে এবার হোক মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডিত ও দলীয়ই তিহাসের সর্বাঙ্গীণ মুক্তি। শুরু হোক জাতীয় ইতিহাস বিনির্মাণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।
