দীর্ঘ আঠারো বছর পর আবারও স্বাধীনতা দিবসে কুচকাওয়াজ ফিরে আসার ঘটনাটি নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতার পুনরাবির্ভাব নয়; বরং এটি একটি জাতির স্মৃতি, চেতনা এবং আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণের প্রতীক। স্বাধীনতার ইতিহাসে এমন কিছু অনুষঙ্গ থাকে, যা কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়—বরং একটি প্রজন্মকে গড়ে তোলার শক্তি। কুচকাওয়াজ সেই রকমই একটি অনুষঙ্গ, যা রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শনীর পাশাপাশি জাতীয় চেতনাকে উজ্জীবিত করার এক অনন্য মাধ্যম।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মেয়েদের বিয়ের আইনি বয়স ১৮ এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর অর্থ দাঁড়ায়, গত ১৮ বছরে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, বিয়ে করেছে, এমনকি সন্তান জন্ম দিয়েছে—তাদের একটি বড় অংশ জীবনে একবারের জন্যও স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়নি। এই বাস্তবতা নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি গভীর সাংস্কৃতিক ও মানসিক শূন্যতার প্রতিফলন।
কারণ কুচকাওয়াজ কখনোই শুধু অস্ত্র প্রদর্শনের অনুষ্ঠান নয়। এটি একটি জাতির ইতিহাস, সংগ্রাম, শৃঙ্খলা, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত প্রতীক। ছোটবেলায় আমরা যারা টেলিভিশনের সামনে বসে কুচকাওয়াজ দেখেছি, তারা জানি—এই অনুষ্ঠান কেবল চোখের আনন্দ দেয় না, এটি হৃদয়ে এক ধরনের গর্ব, উত্তেজনা এবং দেশপ্রেমের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।
আমাদের শিশু-সন্তানরা তখন প্রশ্ন করে—এই সেনারা কারা? তারা কী করে? কেন তারা এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? তখনই পরিবারে, সমাজে শুরু হয় স্বাধীনতার গল্প বলা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদের আত্মত্যাগ, দেশের প্রতি দায়িত্ব—এসব মূল্যবোধ শিশুমনে বপন হয় খুব স্বাভাবিকভাবেই।
অতএব, কুচকাওয়াজ বন্ধ থাকার অর্থ ছিল একটি প্রজন্মকে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত করা। শুধু তাই নয়। প্রজন্মকে ঠেলে দিয়েছে ফেইসবুক এবং ইউটিউবের দিকে। ফলে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—কেন এই অনুষ্ঠানটি এত দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ ইতিহাসের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে একটি রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা কৌশলগত প্রেক্ষাপট থাকে।
অনেকে মনে করেন, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় এই কুচকাওয়াজ বন্ধ থাকার পেছনে কেবল প্রশাসনিক বা আর্থিক কারণ ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শন। সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রের সামরিক ঐতিহ্য ও প্রতীকগুলোকে ধীরে ধীরে গুরুত্বহীন করে তোলার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
স্বাধীনতা লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমান যেমন রক্ষী বাহিনী গঠনের মাধ্যমে সামরিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয়ার প্রয়াস নিয়েছিল।
এখানে আরেকটি বিতর্কিত কিন্তু আলোচিত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে—বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতিকে একটি নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। বিশেষ করে ভারত-এর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা ও ক্রয় নীতিকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ হিসেবে দেখেছেন। যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে সমালোচকদের মতে, সেটি যদি একপাক্ষিক বা কৌশলগত ভারসাম্যহীন হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্বাধীন কৌশলগত সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ শিয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেয়ার মানে কি তা সবাই বোঝে।
এই বিতর্কের ভেতরেই উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—গত দেড় দশকে যদি রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ অপচয় বা পাচার না হতো, তাহলে কি বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা আজ অন্যরকম হতো?
আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষণ সংস্থা Global Firepower অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে মাঝামাঝি শক্তির একটি সামরিক অবস্থানে রয়েছে। এটি দুর্বল নয়, আবার শক্তিশালী বলেও দাবি করা যায় না।
ধরা যাক, গত ১৫ বছরে যে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তার একটি অংশও যদি প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা হতো—তাহলে বাংলাদেশের অবস্থান হয়তো পাকিস্তান, তুরস্ক কিংবা ইরান–এর কাছাকাছি।
আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা বদলে গেছে। এখন আর শুধু সৈন্যসংখ্যা নয়; আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি, সাইবার সক্ষমতা, স্যাটেলাইট নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছু মিলেই একটি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিশাল রাষ্ট্র ভারত, অন্যদিকে অস্থিতিশীল মিয়ানমার—এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি প্রয়োজনীয়তা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো—নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। অর্থনীতি যতই শক্তিশালী হোক, যদি নিরাপত্তা দুর্বল হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে—সামরিক শক্তি বাড়ানো মানেই যুদ্ধ করা নয়। বরং এটি যুদ্ধ প্রতিরোধের একটি কৌশল। ইতিহাস বলে, শক্তিশালী রাষ্ট্রকে আক্রমণ করার আগে প্রতিপক্ষ বার বার চিন্তা করে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের স্বাধীনতা দিবসে কুচকাওয়াজের পুনরাবির্ভাব একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন উপস্থিত থেকে সালাম গ্রহণ করেছেন, এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব এতে অংশগ্রহণ করেছেন।
এই আয়োজন শুধু একটি সামরিক প্রদর্শনী ছিল না; এটি ছিল একটি বার্তা—বাংলাদেশ তার ঐতিহ্যে ফিরে যাচ্ছে, তার চেতনাকে পুনরুদ্ধার করছে।
এই পুনরুজ্জীবনের সামাজিক প্রতিফলন বোঝার জন্য একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখযোগ্য। কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশগ্রহণের পর আমি মোবাইলে ধারণকৃত কিছু ভিডিও ক্লিপ আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছিলাম। সেখানে আমি লিখেছিলাম—
“সুদীর্ঘ আঠারো বছর পর অনুষ্ঠিত হলো মনোমুগ্ধকর কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান। বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করলো আমাদের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী। প্রশ্ন হলো, দেড় যুগ ধরে কেন বন্ধ ছিল এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান??? কারণ তদানীন্তন শাসকদের মুখে ছিল দেশপ্রেম, আর বুকে ছিল অন্য কিছু...!!!???”
এই বক্তব্যটি নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন জাতীয় বঞ্চনার প্রতিক্রিয়া। একটি রাষ্ট্র যখন তার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ করে, তখন তার প্রভাব মানুষের চেতনা ও স্মৃতিতে গভীর ছাপ ফেলে—এবং সেই ছাপই পরবর্তীতে এমন প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পায়।
তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাঠকদের প্রতিক্রিয়া। একজন মন্তব্য করেছিলেন—
“ভাইজান, ইরান–ইসরাইল যুদ্ধের যুদ্ধাস্ত্র দেখে এগুলোকে এখন খেলনা মনে হয়!! ১৭ বছর কোন কিছু করা হয়নি।”
এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যটির ভেতরে লুকিয়ে আছে নির্মম বাস্তবতা। এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান সচেতনতার প্রতিফলন। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে মানুষ এখন বিশ্ব রাজনীতি ও যুদ্ধ বাস্তবতা খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছে এবং স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের দেশের অবস্থানকে সেই প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করছে।
সুতরাং, স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়—আমাদের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে দেশের মানুষের মধ্যে আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং উদ্বেগ—এই তিনটি উপাদানই একসঙ্গে বিদ্যমান।
বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর দিকে তাকালেও আমরা একই চিত্র দেখি। যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতা দিবসে সামরিক কুচকাওয়াজ ও এয়ার শো গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। ফ্রান্সে বাস্তিল দিবসে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক প্যারেড অনুষ্ঠিত হয় প্যারিসের শঁজেলিজে-তে। রাশিয়ার বিজয় দিবসের প্যারেড তো সামরিক শক্তির এক বিশাল প্রদর্শনী।
দক্ষিণ এশিয়াতেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ভারত-এর প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। পাকিস্তান-এর জাতীয় দিবসেও সামরিক প্যারেড অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা হয়।
অর্থাৎ, কুচকাওয়াজ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য, যা জাতীয় পরিচয় ও সামরিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এটি ভিন্ন নয়। বরং আমাদের মতো একটি নবীন রাষ্ট্রের জন্য এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক এবং রক্তক্ষয়ী।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা। একটি পেশাদার সামরিক বাহিনীর প্রধান শক্তি হলো তার নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার।
অতীতে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে—রাজনৈতিক ব্যবহারের, পক্ষপাতের—সেগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে একটি সম্পূর্ণ পেশাদার ও নিরপেক্ষ বাহিনী গড়ে তোলা জরুরি।
সশস্ত্র বাহিনীকে মনে রাখতে হবে—তাদের জন্ম কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়; তাদের জন্ম রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য।
এখানে একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে, ১২ ফেব্রুয়ারির বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাত্র দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার একটি সফল কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করল।
এটাই প্রমাণ করে যে, জিয়া পরিবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে কতখানি ধারণ করে, লালন করে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতি নির্মূল। পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে তারেক রহমান যদি এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেন। তবে সার্বিক উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ সামরিক শক্তিতেও বিপুল বিক্রমে এগিয়ে যাবে। এতে আমার ন্যূনতম সন্দেহ নেই।
সবশেষে বলতে চাই—বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি যেমন বাড়ছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। এই বাস্তবতায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল প্রয়োজন—যেখানে অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা—সবকিছু একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
১৮ বছর পর কুচকাওয়াজ এবং কিছু প্রশ্ন
আহসান হাবিব বরুন
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
২৭ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬, ১২ঃ৩৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Rafiqul Islam
২ মাস আগেThats right.