মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয় বয়ানের বাইরে আনা সম্ভব হবে?

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয় বয়ানের বাইরে আনা সম্ভব হবে?

ফন্ট সাইজ:

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচবার মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বদলেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৭ই আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশ ‘দ্য বাংলাদেশ (ফ্রিডম ফাইটারস) ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অর্ডার, ১৯৭২’-এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে ২০১৮ ও ২০২৫ সালে। এ ছাড়া ১৯৮০ ও ২০২২ সালে সামান্য পরিবর্তন হয়। সর্বশেষ গত বছরের (২০২৫) জুন মাসে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে জাতীয় জীবনে যে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি চলে আসছে, তার অবসান কবে হবে? কবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ চেহারায় দলীয় বয়ানের বাইরে আসতে পারবে? স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও এসব প্রশ্ন উত্থাপন করতে হচ্ছে, তা বেদনার ও লজ্জার বিষয়। কিন্তু জাতির অবিকৃত ইতিহাসের প্রয়োজনে কাজটি করা জরুরি। বর্তমান সরকারের অন্তর্ভূতি ও অংশগ্রহণমূলক শাসন-সংস্কৃতিতে দলীয় ক্ষুদ্রতা ও স্বার্থের বাইরে এসে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনা করা এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করার বিষয়টি সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা যায়।

ইতিহাসের কর্তৃত্ব কে নেবে?
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু এই অর্জনকে ঘিরে গড়ে ওঠা ইতিহাস চর্চা রাজনৈতিক স্বার্থ চিন্তাকবলিত হয়ে বিভাজিত অবয়বে এক জটিল সংকটে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরেও আমরা কি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমরা সঠিকভাবে ধারণ করছি? নাকি আমরা একাধিক দলীয় বয়ানের খণ্ডচিত্র নিয়ে বিভক্ত হয়ে আছি?

একসময় দলীয় আলোকে ইতিহাস রচিত হয়েছে। নিজের ইচ্ছামতো, জোরপূর্বক নিজেদের দিকে টেনে নেয়া হয়েছে ইতিহাসের সত্যকে। এমনকি দল না করলে মুক্তিযোদ্ধাকেও রাজাকার বানানো হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের দলীয় কর্তৃত্বে গড়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ। এই প্রতিযোগিতায় ভুয়া সার্টিফিকেটে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার ‘মুক্তিযোদ্ধা’, আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা রয়ে গেছেন উপেক্ষিত।

এ জন্যই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দলীয় বয়ানের বাইরে এসে একটি অভিন্ন, তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বজনীন কাঠামোতে রূপ নেয়া জরুরি। এবং ইতিহাসের কর্তৃত্ব প্রকৃত সত্যের কাছে হস্তান্তর করাও আবশ্যক।

ইতিহাস বনাম দলীয় কর্তৃত্ব
দৃষ্টান্তের সাহায্যে প্রথমেই আমরা খুঁজে দেখবো, ইতিহাসকে কেমন করে দলীয় কর্তৃত্বে জিম্মি করা হয়েছিল। যা পরবর্তীকালে এক উগ্র প্রতিযোগিতায় রূপ নেয় এবং দলীয় মনোভাব ও কর্তৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার এক বিকৃত প্রবণতার জন্ম নেয়।

কিশোরগঞ্জের স্মৃতি: যেখানে ইতিহাসের প্রথম সুর
কিশোরগঞ্জের ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অথচ গৌরবময় সত্যকে তুলে ধরে। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার টেলিফোন বার্তা আসে মহকুমা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষ, ভাষা সংগ্রামী ডা. এ এ মাজহারুল হকের কাছে। তিনি তখনই আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি মহিউদ্দিন আহম্মদকে ডেকে এনে মাইক দিয়ে শহরে তা প্রচার করেন। উত্তাল কিশোরগঞ্জ মুক্তির তরঙ্গে উজ্জীবিত হয়।
স্থানীয় বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক প্রাণেশ কুমার চৌধুরী, এডভোকেট লিয়াকত হোসেন মানিক, এডভোকেট নাসির উদ্দিন ফারুকী, সাংবাদিক মু. আ. লতিফ এনিয়ে তথ্যনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ করেন। কিশোরগঞ্জ স্বাধীন হয় ১৮ই ডিসেম্বর। সেদিনও ডা. এ এ মাজহারুল হকের গৌরাঙ্গ বাজারের চেম্বারে স্বাধীনতাবিরোধীরা আত্মসমর্পণ করেন।

কিন্তু ইতিহাসের বিচিত্র পরিণতি! মুক্তির বাতাবরণ তৈরি হলে অনেক নেতা তখনো শহরে এসে পৌঁছাননি। সিনিয়র নেতার কৃতিত্ব স্বীকার করা হয়নি। নতুন নেতারা নিজেদের ঢাকঢোল পিটিয়ে কতিপয় স্তাবক নিয়ে ইতিহাস ‘বানাতে’ থাকেন। আওয়ামী লীগের মতো পরে বিএনপিও নিজেদের ইতিহাস রঙ দিয়ে প্রচার করে।

এটি শুধু কিশোরগঞ্জের নয়, সারা দেশের ইতিহাস। যারা প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, যারা প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তাদের অনেকেই দলীয় কর্তৃত্বের খেলায় হারিয়ে গেছেন। আর যারা পরে এসেছেন, তারা হয়েছেন ‘মুক্তিযুদ্ধের নায়ক’।

শুধু ইতিহাসের সত্য উন্মোচন ও সঠিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেই নয়, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অবহেলিত ও মানবেতর জীবনে ঠেলে দেয়ার ঘটনাও কম নয়। এমন করুণ চিত্র পত্রিকার পাতায় এখনো দেখা যায়।

ইত্তেফাক ভবনের সেই সাংবাদিকরা
আশির দশকের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সাংবাদিকতার সুবাদে ইত্তেফাক ভবনে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তখন জেনেছি, ইত্তেফাকে বরেণ্য সাংবাদিক, বর্তমানে মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী এবং তার সহকর্মী সিনিয়র সাংবাদিক আলমগীর হোসেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। আরও অনেকেই ছিলেন সেখানে- রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু সরাসরি দল না করায় তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মান দেয়া হয়নি। তারাও মুক্তিযোদ্ধার সুবাদে বিশেষ কিছু পাওয়ার চেষ্টা কখনো করেননি।

অথচ নানা দল তাদের নিজেদের লোকদের- মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। আর যারা প্রত্যক্ষ অংশ নিয়েছেন, তাদের দলীয় লোক না হওয়ায় এড়িয়ে গেছেন।

এটাই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আঘাত- দলীয় স্বার্থে প্রকৃত বীরদের উপেক্ষা করা, আর দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ উপাধি বিতরণ করা। মুক্তিযোদ্ধা না হলেও তাকে সনদ, পদক দিয়ে পক্ষপাত করার এই দলীয় প্রবণতা সত্যনিষ্ঠ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

ভুয়া সার্টিফিকেট আর অসাধু আমলা
ইতিহাসের গলা টিপে ধরায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যেমন উপেক্ষিত হয়েছে, তেমনিভাবে একদল অসাধু ও সুবিধাবাদী পরিস্থিতির ফায়দা নিয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের পেশাজীবী শ্রেণির লোকজন এগিয়ে আছেন। বিশেষত প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের একদল লোক রাজনৈতিক আনুগত্যের মাধ্যমে ফায়দা লুটে চলেছেন।

মুক্তিযোদ্ধা তৈরির কারখানা
রাজনৈতিক পরিস্থিতির একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়া মানে দাঁড়ায় সুযোগ-সুবিধার দ্বার খোলা। সরকারি চাকরিতে কোটা, বিদেশ ভ্রমণে বিশেষ সুবিধা, অযাচিত প্রমোশন, সম্মানী ও অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা- মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় হয়ে ওঠে এক বিশেষ অভিজাত ও লাভজনক অবস্থান। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন কতিপয় অসাধু আমলা। তারা দলীয় প্রবণতা বুঝে জাল সার্টিফিকেট দিয়ে তৈরি করেছেন নতুন নতুন ‘মুক্তিযোদ্ধা’। বাগিয়েছেন প্রমোশন। বাড়িয়েছেন চাকরির মেয়াদ।

যারা কখনো অস্ত্রহাতে যুদ্ধ করেননি, যারা একটি দিনও যুদ্ধক্ষেত্রে কাটাননি, তারা হয়েছেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’। আর যারা জীবনপণ করেছেন, যুদ্ধ করেছেন, তাদের অনেকে হয়েছেন ‘বিতর্কিত’, অবহেলিত ও উপেক্ষিত।

এটি শুধু ব্যক্তিগত অসাধুতার বিষয় নয়, এটি ছিল একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। দলীয় কর্তৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ তৈরি করে দেয়া হয়েছে। আর সেই গ্রুপের ভেতর থেকে উঠে এসেছে ভুয়া সার্টিফিকেটের শৃঙ্খল। কে আসল আর কে নকল, সেটাই এখন এক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

দলীয় বয়ানের দুই মেরু
মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে দলীয় দখলদারি শুধু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাই তৈরি করেনি, ইতিহাসকেও করেছে বিদীর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় ইতিহাস পরিণত হয়েছে দলীয় বয়ানের বিষয়বস্তুতে। একদল দরবারি লেখক ও তথাকথিত ইতিহাসবিদ এসব বিকৃতিকে মহিমান্বিত করেছেন লেখালেখির মাধ্যমে। সত্য ইতিহাস চাপা পড়েছে দলীয় দ্বৈরথের ফলে সৃষ্ট বিকৃতির আবর্জনার স্তূপে।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস চর্চা
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে উপস্থাপন করা হয়েছে দলীয় সাফল্যের গল্প হিসেবে। আওয়ামী লীগের নেতারাই যেন মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র নায়ক। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে শুরু করে মুজিবনগর সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত- সবকিছু আওয়ামী লীগের একক কৃতিত্ব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দলের বাইরের ব্যক্তি বা সংগঠন যত বড় ভূমিকাই রাখুক না কেন, তাদের স্থান হয়েছে উপেক্ষায়।

বিএনপি’র পাল্টা বয়ান
বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তারা শুরু করেন পাল্টা ইতিহাস রচনা। সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তৈরি করা হয় এক নতুন ইতিহাস নামের ভাষ্য। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের যে কাঠামো, বিএনপি তার বিপরীতে গড়ে তোলে ‘জাতীয়তাবাদী’ মুক্তিযুদ্ধের ধারণা।

এভাবে দুই দলীয় বয়ানের মাঝে পড়ে যায় প্রকৃত ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র- সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবদান, সাংবাদিক-পেশাজীবীদের প্রচেষ্টা, নারী মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ- সবকিছু ছেয়ে যায় দলীয় পতাকার আচ্ছাদনে।

কেন ইতিহাসের এই দুর্দশা?
স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসকে বিভাজিত করার ফল ভালো হয়নি। দুর্দশার শিকার হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। সত্য আর মিথ্যার মাঝখানে হারিয়ে যেতে থাকে প্রকৃত ইতিবৃত্ত। কেন এমন হয়েছে, তা নিয়ে কেউ ভাবেননি। কোনো সরকারই নৈর্ব্যক্তিক অবস্থান নিয়ে প্রকৃত সত্যের উন্মোচন করতে আগ্রহী হয়নি। অথচ জাতির ঐক্য, সংহতি ও বিশ্বাসের জন্য একটি সত্য বয়ান ও প্রকৃত ইতিহাস থাকা খুবই জরুরি বিষয়।

শিক্ষা ও পরিকল্পনার অভাব
স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সচেতনভাবে ধারণ করার জন্য যে শিক্ষা, পরিকল্পনা এবং জাতিগতভাবে উদ্যোগ নেয়ার দরকার ছিল, তা আমরা নিতে পারিনি। অভিন্ন একটি কাঠামোর মধ্যে আনা প্রয়োজন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। কিন্তু তা হয়নি।

পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্থান পেয়েছে, কিন্তু সেটি হয়েছে দলীয় আদর্শের ছকে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করেছে নিজেদের ইতিহাস চর্চার আলোকে। ফলে এক প্রজন্ম এক ইতিহাস পড়েছে, অন্য প্রজন্ম আরেক ইতিহাস। জাতীয় ইতিহাসে পরিণত হয়নি মুক্তিযুদ্ধ, হয়েছে পরস্পর-বিরোধীদলীয় ইতিহাসের সংযোজন।

মুক্তিযোদ্ধাদের দ্বিধাবিভক্তি
দ্বিতীয় কারণ, যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন তারা নিজেরাই প্রায়শ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে, নেতৃত্বের লোভে ও স্বার্থ-দ্বন্দ্বে। তারা নিজেদের কৃতিত্ব জাহিরের চেষ্টা বেশি করেছেন অন্যকে সরিয়ে দিয়ে, যেটা ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি। কোনো সংগঠন বা ব্যক্তি ইতিহাসের পুরো সত্যটা তুলে ধরার চেয়ে নিজের অবস্থানটাকে শক্তিশালী করতে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। এতে ভেঙে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের ঐক্য ও সামগ্রিক কাঠামো আর তৈরি হয়েছে উপদল, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও অনৈক্য।

ভাস্কর্য ভাঙাচোরা মন
সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভাঙার পেছনে ধর্মান্ধ কিছু মানুষের আক্রোশ কাজ করেছে। যদিও ইরাক-ইরানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও ভাস্কর্য আছে। কিন্তু সভ্যতার ইতিহাস তারা জানে না। তাদের ধর্মীয় বোধ গড়ে উঠেছে যুক্তির বদলে আবেগের ওপর নির্ভর করে।সত্যিকারের জ্ঞানী যারা, তাদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কটা গড়ে উঠছে না। জনমত ও জনমানব দলীয় বিভেদ ও আবেগের চক্করে বিভক্তই রয়ে গেছে।

ভাস্কর্য ভাঙা শুধু ধর্মান্ধতার প্রকাশ নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার আরেকটি প্রচেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভাস্কর্যের মাধ্যমে ধারণ করার যে সংস্কৃতি, সেটি ধ্বংস করে দেওয়ার যে মানসিকতা, তা আমাদের জাতীয় জীবনে গভীর বিভাজন তৈরি করেছে।

বিভক্ত জাতির সংকট
শুধু মুক্তিযুদ্ধই নয়, মৌলিক জাতীয় ইস্যুতেও তৈরি হয়েছে বিভাজনের ধারা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে সব সময়ই দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয় এবং ঐকমত্যের পথ খুঁজে পায় না, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই বিভাজন। আর বিভক্ত জাতি সুশাসনের প্রশ্নে বা গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভেদের প্রাচীর সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।

বাঙালি না বাংলাদেশি: আত্মপরিচয়ের সংকট
আত্মপরিচয়ের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে জাতিগত এবং রাষ্ট্রীয় সংকট।আমরা বিভক্ত জাতি।আমাদের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় ঘটছে না। দ্বন্দ্বগুলো রেখে দিয়ে সমন্বয় করা যায় না। দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো বিশেষক্ষেত্রে আমরা সমন্বিত হচ্ছি, তবে তা আদর্শগত ভাবে নয়। আমরা আত্মপরিচয়ের সংকটেরই সমাধান করিনি। বাঙালি, না বাংলাদেশি-এই পরিচয় নির্ধারণ নিয়ে আমাদের অনেক সংশয়। একদিকে আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী, অন্যদিকে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাও দুর্বল নয়।এই দ্বন্দ্বের মাঝে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একটি স্থায়ী কাঠামোয় আনা সম্ভব হয়নি।

সংকটগুলোকে সমন্বয়ের মধ্যে না আনায় বিভেদের আগুন নিভে নি, দাউ দাউ করে জ্বলছে। এভাবে বছরের পর বছর পুরো জাতিকে সংকট ও বিভেদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হলে তারা সমস্যার মধ্যেই আবর্তিত হতে থাকবে। সব ধারার, সব মতাদর্শের মানুষের মধ্যে ডিবেটও আলাপ হতে হবে। এটা কোনো রাজনৈতিক ব্যানারে সম্ভব নয়। মুক্তবুদ্ধির চর্চা হতে হবে অরাজনৈতিক অবস্থান থেকে। যার যা প্রাপ্য তা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে অবস্থান নিয়ে স্বীকার করার উদারতা দেখাতে হবে সংশ্লিষ্টদের, যা হতাশাজনকভাবে খুবই অনুপস্থিত। বদলে হিংসা, বিদ্বেষ, আক্রমণ ও নিন্দা-মন্দের বাড়-বাড়ন্ত চলছে।

লেখক: প্রফেসর ও চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন