শৈশবে পাঠ্য বইয়ে পড়েছিলাম, ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। সেই শৈশব থেকে জীবনের নানা পর্যায়ে নানা রূপে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে এসেছি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেমন চারপাশের পরিবেশ বদলেছে, তেমনি বদলেছে ঈদের আনন্দের সংজ্ঞাও।
আমার চাকরিজীবী বাবা যখন প্রথম খিলগাঁওয়ে এসে বসতি গড়েন, তখন খিলগাঁও ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। গাছ-গাছালির এমন ঘনত্ব ছিল যে, সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার আগেই চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসতো। দিনের বেলাতেই শেয়ালের ডাক শোনা যেত। বাবা যার কাছ থেকে জমি কিনে বসতি গড়েছিলেন, তিনি ছিলেন ঢাকার আদি বাসিন্দা মোল্লা সাহেব। বাবা তখন সচিবালয়ে চাকরি করতেন। খিলগাঁওয়ে বসবাস শুরু করার পর তিনি তাঁর কয়েকজন সহকর্মীকেও এখানে বসতি গড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। বলছি পাকিস্তান আমলের কথা।
চাকরিজীবী মানুষ, সীমিত আয়েই পরিবার চালাতে হতো। তখনকার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা আজকের মতো ছিল না। পরিবারগুলো ছিল আকারে বড়। একেকটি পরিবারে কমপক্ষে আট থেকে দশজন সদস্য। আমাদের শৈশবে সারা বছরের প্রধান উৎসব ছিল এই দুই ঈদ। ঈদ এলেই পুরো পাড়া জুড়ে আনন্দের এক আলাদা জোয়ার বয়ে যেত। তখন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ির দূরত্ব ছিল বেশি, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের টান ছিল গভীর, সম্পর্ক ছিল নিবিড়। আমরা সবাই সবাইকে চিনতাম।
এখন বাড়িগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ মানুষে মানুষে দূরত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ। বাড়ির পরিধি বেড়েছে উল্লম্বভাবে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে বসবাস করছে। কেউ কাউকে চেনে না। চেনার মতো সময়ও নেই আমাদের। ঈদ এখন অনেকটাই পরিবারকেন্দ্রিক এক দিনের মিলনমেলা।
অথচ আমাদের শৈশবে ঈদের প্রস্তুতি শুরু হতো রমজান শুরুরও আগে। ঈদকে ঘিরে থাকতো নানান পরিকল্পনা। আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না আমাদের সময়ের ঈদ কেমন ছিল। কারণ আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তখনকার মতো ছিল না। বাংলাদেশ এখন বস্ত্রশিল্পে বিশ্বের প্রথম সারির দেশ। বাহারি পোশাকে সবাই সজ্জিত। অন্তত এখন আর এই দেশে কেউ বস্ত্রহীন থাকে না। অথচ আমাদের শৈশবে অন্নহীন, বস্ত্রহীন অসংখ্য দরিদ্র মানুষ দেখেছি।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নতুন পোশাক কিনতো মূলত ঈদকে কেন্দ্র করেই, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। অনেক সময় কিনতে পারতো না। তখন পুরনো জামা ধুয়ে, ইস্ত্রি করে পরা হতো। তবু ঈদের আনন্দ কমতো না। আমাদের শৈশবে ঈদের আরেক নাম ছিল নতুন কাপড়ের আনন্দ। আব্বা যে নতুন কাপড় কিনে দিতেন, তা আমরা লুকিয়ে রাখতাম। পাড়ার বন্ধুদের কাউকেই দেখানো যাবে না। দেখালেই মনে হতো ঈদ শেষ হয়ে যাবে।
ঈদের দিন সকালে গোসল শেষে নতুন কাপড় পরে যেতাম ঈদের নামাজে। তখন শুরু হতো কার শার্ট কেমন, কে কোন স্টাইলের প্যান্ট কিনেছে এসব নিয়ে আলোচনা। নতুন জুতা পরে মাটিতে পা রাখতাম ঈদের দিনেই। কেনার পর জুতা পায়ে দিয়ে বিছানার ওপর হাঁটতাম, যেন একটুও ময়লা না লাগে।
ঈদের আরেকটি বড় আনন্দ ছিল সেমাই খাওয়ানো। পাড়ার দুই বন্ধু তসলিম আর কাইজারের সঙ্গে যেমন আমার বন্ধুত্ব ছিল, তেমনি তাদের বাবা-মা’র সঙ্গে আমার বাবা-মা’রও গভীর সম্পর্ক ছিল। তখন মানুষে মানুষে হৃদ্যতা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও গভীর। ঈদের দিনে বন্ধুরা আমাদের বাসায় আসতো মায়ের রান্না করা শুকনো সেমাই খেতে। মায়ের হাতের সেমাইয়ের স্বাদ ছিল অনন্য। আবার তসলিমের মায়ের হাতে রান্না করা দুধ সেমাইয়ের স্বাদ ছিল একেবারে আলাদা। আমাদের বাসায় সেমাই খেয়ে আমরা ছুটতাম তসলিমের বাসায়। সেমাই খাওয়া শেষে সারাদিন বন্ধুরা মিলে ঘুরে বেড়াতাম।
ঈদে সিনেমা হলে মুক্তি পেতো নতুন নতুন সিনেমা। সেই সিনেমাগুলো দেখাও ছিল ঈদের আনন্দের অংশ। মনে হতো ঈদ মানেই একের পর এক আনন্দের আয়োজন।
আরও একটু বড় হওয়ার পর ঈদের আনন্দে যুক্ত হলো টেলিভিশন। ঈদ মানেই সপ্তাহ জুড়ে টেলিভিশনে নানা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। নাটক ও সিনেমার পাশাপাশি ঈদের মূল আকর্ষণ ছিল ‘ঈদ আনন্দমেলা’। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম এই অনুষ্ঠানটির জন্য। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের উপস্থাপনা ছিল অসাধারণ। সেই সময় টেলিভিশন ছিল গ্ল্যামার আর আকর্ষণের প্রতীক। উপস্থাপকরা পরতেন জমকালো পোশাক। এর মাঝেই আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে উপস্থিত হতেন। তাঁর কথার গভীরতা আর মেধার গ্ল্যামারেই দর্শক মুগ্ধ হয়ে যেত।
আমি যখন নিজে টেলিভিশনে কাজ শুরু করলাম, তখন লক্ষ্য করলাম ঈদের অনুষ্ঠান মানেই শহরকেন্দ্রিক বিনোদন। অথচ তখনো দেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ বাস করতো গ্রামে। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে গ্রামীণ মানুষের অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, তাদের বিনোদনের কথাও ভাবা হতো না। তখনই মনে মনে ভাবলাম, যদি কখনো সুযোগ পাই, তবে কৃষিজীবী মানুষের অংশগ্রহণে তাদের জন্যই একটি ঈদ অনুষ্ঠান নির্মাণ করবো।
পরবর্তীতে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যানেল আই প্রতিষ্ঠার পর সেই সুযোগ এলো। শুরু করলাম কৃষকদের সরাসরি অংশগ্রহণে ঈদ অনুষ্ঠান ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’। প্রতিবার কোনো নদীর তীরে, খোলা মাঠে, একেবারে কৃষকের নিজস্ব জায়গায় এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। দেখলাম কৃষকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। আরও দেখলাম, যে এলাকায় অনুষ্ঠান ধারণ হয়, সেখানে পুরো গ্রাম জুড়ে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। পাড়া, গ্রাম, এমনকি পুরো উপজেলা যেন উৎসবে মেতে ওঠে। দূর- দূরান্ত থেকে মেহমান আসে। ঘরে ঘরে ঈদের আমেজ।
একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রাম এক হয়ে যায়। বাড়িতে মেয়ে-জামাই বেড়াতে আসে। পিঠে-পুলি হয়। অনুষ্ঠানস্থলে বসে মেলা। কেউ মুড়ি-মুড়কি ভাজে, কেউ গরম গরম জিলাপি ভেজে বিক্রি করে। এক অপূর্ব আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়। এই আয়োজনের জন্য আমি প্রতিবার অপেক্ষা করে থাকি।
গত বিশ বছরে ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ নিয়ে কত যে প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়েছি, তার হিসাব নেই। মনে পড়ে নওগাঁর আত্রাইয়ের দুর্গম গ্রাম চর শিমলার কথা। তখন গ্রামটিতে যাওয়ার মতো সড়ক ছিল না। মূলত ফসলের মাঠের আঁল কেটে গাড়ি চলার পথ তৈরি করা হয়েছিল। কোথাও ব্রিজ আছে, কোথাও কালভার্ট আছে, কিন্তু সংযোগ সড়ক নেই। শুকনো মৌসুম ছিল বলে কোনোমতে গাড়ি নিয়ে পৌঁছানো গিয়েছিল। লক্ষ্য করলাম, গ্রামের শিশু-কিশোররা বিস্ময়ের চোখে গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। পরে জানতে পারলাম, এর আগে সেখানে কখনো চার চাকার গাড়ি যায়নি। তারা বাস্তবে কখনো এমন গাড়ি দেখেনি।
এরপর আরও বিস্ময়কর তথ্য জানলাম। ওই গ্রামে আত্মহত্যার ঘটনা প্রায় নিয়মিত। গ্রামটি আত্মহত্যার গ্রাম নামে পরিচিত। সবুজে ঘেরা সুন্দর এই গ্রামের মানুষ কেন আত্মহত্যা করবে, সেই প্রশ্ন আমাকে নাড়া দিলো। স্থানীয় থানায় গিয়ে জানলাম, ঋণের বোঝা বহন করতে না পেরে কৃষক আত্মহত্যা করে, তরুণরা আত্মহত্যা করে কাঙ্ক্ষিত জীবন না পেয়ে।
মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে জীবনের আনন্দ। আনন্দ মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়। ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’কে ঘিরে গ্রামটির মানুষ যেন নতুন করে আনন্দের স্বাদ পেলো। তারা কয়েকদিন সেই আনন্দে মেতে থাকলো। সমাজ গবেষকরা হয়তো এর গভীর ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। আমি শুধু তাদের মনে আনন্দের একটি উপলক্ষ এনে দিয়েছিলাম।
শহরের মানুষ সাধারণত খুব পরিমিতভাবে জীবনযাপন করে। তাদের আনন্দ প্রকাশও সীমিত, এমনকি হাসিটাও নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু গ্রামের মানুষ যখন হাসে, তারা প্রাণ খুলে হাসে। তাদের সেই আনন্দ দেখে আমার মন ভরে যায় এক গভীর তৃপ্তিতে।
‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ আমি নির্মাণ করলেও অনুষ্ঠানটি আর আমার একার থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে দর্শকের অনুষ্ঠান। শুধু গ্রামীণ নয়, শহরের দর্শকরাও এটি আপন করে নিয়েছে। প্রতিবার অসংখ্য চিঠি, ই-মেইল আর ফোন পাই। সেগুলোই হয়ে ওঠে আমার ঈদ আনন্দের বড় উৎস। এখন আমার কাছে ঈদের আরেক নাম ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’।
গ্রাম ও নগরের পার্থক্য দিন দিন কমে আসছে। বদলাচ্ছে আনন্দের সংজ্ঞা। কিন্তু নির্মল আনন্দের উৎস আজও একই। মানুষই মানুষের আনন্দের মূল উপাদান। মানুষ মানুষের কাছেই ফিরে আসে, মানুষকে আঁকড়ে ধরেই জীবনের আনন্দ খুঁজে নেয়।
সময়ের সঙ্গে ঈদ আনন্দের রূপ বদলালেও ঈদের পবিত্রতা অমলিন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে জীবনকে সরল করার যে আনন্দ, সেটিই ঈদের মূল কথা। ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি।
ঈদ সংখ্যা ২০২৬
ঈদ মানে আনন্দ
শাইখ সিরাজ
অনলাইন
২ মাস আগে
২৪ মার্চ (মঙ্গলবার), ২০২৬, ৫ঃ৩৬ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
