প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, শক্তিমান লেখক ও গবেষক, দক্ষ ও প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান, বাংলাদেশের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ১৬ মার্চ ছিল ৫ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২১ সালের ১৬ মার্চ সিঙ্গাপুরে মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৮১ বছর।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জের মানিকপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ঢাকা ও কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসা, কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মাওলানা মমতাজ উদ্দিন আহমেদ এবং মা বেগম আম্বিয়া খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ছিলেন চতুর্থ। তিনি পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের জামাতা ছিলেন। তার স্ত্রী হাসনা জসীমউদ্দীনের মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন।
বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। একাডেমিক ফিল্ড, আইনপেশা ও রাজনীতি- যেদিকেই তিনি বিচরণ করেছেন সেদিকেই তিনি যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। এরপর ষাটের দশকে ইংল্যান্ডের বিশ্বখ্যাত অনারেবল সোসাইটি অব লিংকন্স ইন থেকে ব্যারিস্টার হন। এরপর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পরই হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেন। আইন পেশা ও রাজনীতির পাশাপাশি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিভিন্ন সময় বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফেলো ও ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং প্রফেসর ছিলেন। এছাড়া ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ও ভিজিটিং ফেলো ছিলেন একাধিকবার।
মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকদের অন্যতম একজন ছিলেন। ১৯৭১ সালে লন্ডনে অবস্থান করে তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশে জনমত সৃষ্টির জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তিনি “বাংলাদেশ” নামে একটি ইংরেজি মুখপত্র নিয়মিত প্রকাশ করার উদ্যোগ নেন মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ প্রচার করার জন্য। এর আগে ষাট দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি অন্যতম আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সোচ্চার ছিলেন খোদ স্কুল থেকে। স্কুলের ছাত্র থাকার সময় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ জেল খেটেছিলেন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাহেবের সাথে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বেশ কয়েকবার তার সঙ্গে ঢাকায় ও লন্ডনে সাক্ষাত হয়েছে ও বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। তার মৃত্যুর বেশ কয়েক বছর আগে তার লন্ডন সফরকালে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে বিলেতের বিদগ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে মতবিনিময় অনুষ্ঠান করি। অত্যন্ত অমায়িক ও সদালাপী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। কথা বলতেন গুছিয়ে। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক স্মৃতি আছে তাকে নিয়ে। ২০০০ সালে ঢাকায় তার চেম্বারে জয়েন করার অফার দিয়েছিলেন। তাকে চিঠি লিখলে ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় ফিরে চিঠিটি পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিয়েছিলেন। দেশে গিয়ে সেটেল্ড হইনি বিধায় তার চেম্বারে আর জয়েন করা সম্ভব হয়নি।
প্রায় এক দশক আগে একবার সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগের তৎকালীন সিনিয়র বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী মহোদয়ের একটি ইংরেজী বইয়ের রিভিউ আমি বাংলাদেশের ইংরেজি একটি দৈনিকে লিখলে আমাকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে ইমেইল পাঠিয়েছিলেন। তিনি ১/১১ এর সময় জেলে থাকাকালীন সময়ে তার স্ত্রীর (মিসেস হাসনা জসীমউদ্দিন মওদুদ - পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের মেয়ে) সঙ্গে একাধিকবার লন্ডনে সাক্ষাৎ হয়েছে এবং তিনি আমার বাসাও সফর করেছেন। তার ঐ কঠিন সময়ে লন্ডনে তার স্ত্রীকে আমার চেম্বারে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বর্তমান এমপি ও সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এবং ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের দীর্ঘদিনের জুনিয়র ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে সবাই জানেন ও চেনেন একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে। বস্তুত তিনি বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী ছিলেন। রাজনীতিতে তিনি প্রায় সব সময় ক্ষমতার আশেপাশে থাকতেন বলে জনশ্রুতি ছিল। বাংলাদেশে ক্ষমতা আর পদের কোনো আসনে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন না। ছিলেন তিনি ধারাবাহিকভাবে পোস্টমাস্টার জেনারেল, ডাক, টেলিগ্রাফ এবং টেলিফোন মন্ত্রী, বিশেষ কার্যাদি (কল্যাণ) মন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রী, যোগাযোগ মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, পানি সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, আইন, সংসদ ও বিচার মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের উপনেতা, উপপ্রধানমন্ত্রী, এবং প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি পদটি তার শুধু বাকী ছিল।
রাজনীতিবিদ হিসেবে তার অনেক আলোচনা-সমালোচনা আছে। কিন্তু তিনি যে একজন উঁচুমানের লেখক, বিশ্লেষক, চিন্তক ও গবেষক তা অনেকে হয়তো জানেন না। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলা ও ইংরেজিতে প্রায় ডজন খানেক বড় আকারে মানসম্মত বই লিখেছেন। তার সব কটি বই ডাউস আকারের - একেকটি তিন শত থেকে পাঁচ শত পৃষ্ঠার। ছাপিয়েছেও আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো, যথা UPL, Heidelberg University, Oxford University Press প্রভৃতি।
পাণ্ডিত্যপূর্ণভাবে লেখা (Scholarly written) তার বইগুলোতে তিনি সমসাময়িক ও ঐতিহাসিক ঘটনাসমূহের যথাসম্ভব বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। তাতে তার নিজ দলের সমালোচনা ও তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে। মাঝে মধ্যে মনে হয় ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দল পরিবর্তনের রাজনীতি করে রাজনীতিবিদ না হয়ে শুরু থেকে যদি সম্পূর্ণ মনেযোগ একাডেমিক ফিল্ডে বা আইনি পেশায় মনোনিবেশ করতেন তাহলে তিনি আন্তর্জাতিক মানের সুপরিচিত একজন একাডেমিক বা আইনজ্ঞ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতেন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যে ব্যক্তিগতভাবে একজন সজ্জন, রুচিশীল, স্মার্ট, শক্তিমান লেখক ও দক্ষ এবং প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান এ কথা তার কঠোর সমালোচকরাও স্বীকার করে থাকেন। তার এ যাবত কালের সংসদে দেয়া সব বক্তব্য সংকলিত করে “সংসদে যা বলেছি” নামে চমৎকার একটি বই প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। সংসদে দেয়া তার বক্তব্যগুলো অত্যন্ত শালীন, যৌক্তিক, প্রজ্ঞাময়, ধীশক্তিসম্পন্ন ও উন্নতমানের ভাষাসম্মলিত। শব্দচয়ন অত্যন্ত চমৎকার। বর্তমান ও সমসাময়িক এমপিদের এ বইটি পড়া দরকার কেননা এ থেকে জানা যাবে সংসদে কী ধরনের ভাষায় কথা বলা দরকার। তরুণ ও নবীন এমপিদের এ বইটি অবশ্যই পড়া দরকার সংসদে অন্তত: ভাষার দিক দিয়ে গুনগত পরিবর্তন আনার জন্য। ৩১৪ পৃষ্ঠার চমৎকার ডাউস আকারের এই বই।
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন শক্তিমান লেখক, গবেষক, খ্যাতিমান আইনজীবী, সজ্জন ও সহনশীল রাজনীতিবিদ, দক্ষ ও প্রাজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানকে হারিয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদের ট্রেজারি বেঞ্চ ও বিরোধী দলে দক্ষ ও প্রাজ্ঞ এমপিদের দারুণ অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমন সংসদে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মতো ব্যক্তিত্বের অনুপস্থিতি গভীরভাবে উপলব্ধি করা যাচ্ছে। তার উপস্থিতি সংসদকে প্রাণবন্ত করতো, নবীণরা শিখতে পারতেন ও সংসদীয় গণতন্ত্র সমৃদ্ধ হতো। আমি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহপাক যেন মানুষ হিসেবে তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করেন। আমীন।
নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।
Email: [email protected]
আইন, রাজনীতি ও গবেষণা - এই তিনের গতিময় কিংবদন্তি পুরুষ ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
মত-মতান্তর
২ মাস আগে
১৯ মার্চ (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ১০ঃ২০ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%

Shamsul Hoque
২ মাস আগেHe is one of best leader in Bangladesh. He was not involved in any corryption. I saw He helped lot of people. His behaviour was very nice and polite. He is very lelent and he wrote many very important books which published by amazon.
তিনি বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা। তিনি কোনো দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন না। আমি দেখেছি তিনি অনেক মানুষকে সাহায্য করেছেন। তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও নম্র। তিনি অত্যন্ত জ্ঞানী এবং তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন যা অ্যামাজন থেকে প্রকাশিত হয়েছে।