দ্য ইকোনমিস্টের রিপোর্ট

বাংলাদেশকে পেতে ইসলামপন্থিরা ইসলাম বাদ দিয়ে অন্য সবই করে

ফন্ট সাইজ:

চব্বিশের আগস্টে বাংলাদেশের ‘জেন-জি’ বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় বিস্ময় হিসেবে দেখা দিয়েছে ইসলামপন্থিদের পুনরুত্থান। শেখ হাসিনার শাসনামলে যে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, গত মাসের নির্বাচনে তারা দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইতিহাস গড়েছে। প্রাপ্ত ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই গেছে তাদের ঝুলিতে। জামায়াতের এই ফিরে আসার মূলে রয়েছে তাদের প্রথাগত প্ল্যাটফরম থেকে কৌশলে সরে আসা। বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি এখন ধর্মীয় শেকড়ের চেয়ে নিজেকে ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ বা প্রচলিত ব্যবস্থা-বিরোধী শক্তি হিসেবে তুলে ধরছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করার যে ইতিহাস দলটির রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে তারা এখন পরিবর্তন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এবং সুশাসনের ওপর জোর দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র দীর্ঘদিনের ‘পারিবারিক রাজনীতি’ ও দুর্নীতির বিপরীতে জামায়াত নিজেকে একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে ব্র্যান্ডিং করছে।
সবচেয়ে সুকৌশলী পদক্ষেপ দেখা গেছে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে। গত শরতে বড় বড় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে তাদের ছাত্র সংগঠন জয়লাভ করে। কেবল ধর্মীয় বয়ান নয়, বরং শিক্ষার্থীদের পড়ার সেশন আয়োজন, কল্যাণমূলক কাজ কিংবা হলের নষ্ট ফ্যান ঠিক করে দেয়ার মতো জনমুখী কাজের মাধ্যমে তারা সাধারণ ছাত্রদের মন জয় করেছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের আয়োজিত ‘হিজাব র?্যালি’তে এমন অনেক নারী অংশ নিয়েছেন, যারা আদর্শগতভাবে ইসলামপন্থি নন। হিজাব এখন অনেক তরুণীর কাছে এক ধরনের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের আগে জেন-জি বিপ্লবীদের নতুন দলের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করা ছিল জামায়াতের একটি বড় চাল। যদিও সেই নতুন দল থেকে মাত্র ছয়জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, কিন্তু এই জোটের মাধ্যমে জামায়াত নিজেকে গণ-অভ্যুত্থানের বিজয়ী পক্ষ হিসেবে সফলভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে।
তবে দলটির প্রকৃত রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। বিএনপি’র নতুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অনেকেই মনে করেন, জামায়াতের ভবিষ্যৎ দর্শন আসলে কী তা পরিষ্কার নয়। এ ছাড়া দলটির ভেতরে মডারেট ও কট্টরপন্থিদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে। আমীর ডা. শফিকুর রহমানের কিছু মন্তব্য দেশের নারী সমাজকে ক্ষুব্ধ করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে কয়েক দশক ধরে নারী প্রধানমন্ত্রীরা দেশ শাসন করেছেন। পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে জামায়াত। ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবে- এমন প্রশ্নে শফিকুর রহমান মূলত মধ্য-ডানপন্থি ঘরানার উত্তর দেন। যেমন ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি, শ্রমবাজার অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের সংস্কার। শরিয়াহ আইন নিয়ে তাদের তাত্ত্বিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমীর একে ‘ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ ও ক্ষমতার সংযম’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছেন। এই অস্পষ্ট সংজ্ঞার বিরোধিতা করা কঠিন, আর সম্ভবত এটাই তাদের কৌশল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন