দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে আবারো কর্মচাঞ্চল্য ফিরেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কুমিল্লা। জেলার বিভিন্ন সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণে নতুন গতি আসায় বদলে যেতে শুরু করেছে কুমিল্লার গ্রামীণ জনপদের চিত্র।
সূত্র জানায়, এক সময় নানা জটিলতা ও প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে এলজিইডি কুমিল্লার অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ধীরগতিতে চলছিল। দীর্ঘদিন ধরে ফাইল জট, বিল পরিশোধে বিলম্ব এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতার কারণে গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে জেলার অনেক গ্রামীণ সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ভাঙাচোরা সড়কে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও ভোগান্তিতে পড়তে হতো সাধারণ মানুষকে। এ ছাড়া ঠিকাদারদের অনেকেই সময়মতো কাজের বিল না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান, কাজ শেষ করেও দীর্ঘদিন বিলের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এতে অনেক প্রকল্প মাঝপথে থেমে থাকতো এবং কাজ বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হতো। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে গত বছরের ২রা ডিসেম্বর কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সামনে স্থানীয় ঠিকাদার ও এলাকাবাসী মানববন্ধন করেন। তখন এলজিইডি কুমিল্লার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল মতিনের অপসারণের দাবিও ওঠে।
পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় গত বছরের ১৪ই ডিসেম্বর। ওইদিন কুমিল্লায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন মো. মফিজ উদ্দিন (বাবলু)। দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই তিনি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তদারকিতে জোর দেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তার তত্ত্বাবধানে এখন জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গতি ফিরেছে। এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কুমিল্লা জেলায় প্রায় ২০টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ, পাথর ও বিটুমিনের মাধ্যমে সড়ক উন্নয়ন, সেতু সংস্কার এবং বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, যা গ্রামীণ যোগাযোগ ও অর্থনীতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের আওতায় গৃহীত ৩০টি স্কিমের মধ্যে ইতিমধ্যে চারটির কাজ শেষ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর বেশির ভাগ কাজ গত তিন মাসে দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের বড় অংশ গত দুই মাসে শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লী সড়ক পুনর্বাসন, প্রোগ্রাম ফর সাপোর্টিং রুরাল ব্রিজেস, সিআইবিআরআর-১ ও সিআইবিআরআর-২ এবং ইউএইচবিপি প্রকল্পের আওতায় জেলার বিভিন্ন স্থানে নতুন সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে। শুধু সড়ক ও সেতু নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নেও জোর দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় জেলার বেশির ভাগ শিক্ষা ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শতভাগ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় হাট-বাজার উন্নয়ন, টিউবওয়েল ও পাবলিক টয়লেট স্থাপনের কাজও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এলজিইডি কুমিল্লার কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর নিবিড় তদারকি ও কঠোর মনিটরিংয়ের কারণে অফিসে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুস শাকের, সহকারী প্রকৌশলী দীপু সূত্রধর ও উচ্চমান সহকারী মো. ইকবাল হোসেন বলেন, নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রকল্প নিয়মিত তদারকি ও পর্যালোচনা সভার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে।
কর্মপরিবেশ ইতিবাচক রাখতে অফিসের ভেতর সামাজিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত শীত মৌসুমে এলজিইডি কুমিল্লা প্রাঙ্গণে ‘প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দীক স্মৃতি ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্ট-২০২৬’ আয়োজন করা হয়। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিজ উদ্দিন বাবলু বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে কোনো ঠিকাদার যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের বিশেষ কর্মসূচির অংশ হিসেবে খাল ও পুকুর খনন প্রকল্পও গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাকি থাকা কিছু জটিল কাজও দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। এসব কাজ শেষ হলে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে এবং গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে কর্মচাঞ্চল্য এলজিইডি কুমিল্লা
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে
১৫ মার্চ (রবিবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
